আজ আর আমার কিছু মনে নেই
কিছু মনেও থাকে না।
কিছু দিন হয়-হর-হামেশাই ভূলে যাই,
কাউকে দেয়া কথা
কিংবা কারো আবদার।
হর-হামেশাই ভূলে যাই
অতীতের অসমাপ্ত কর্ম
কিংবা আগামী দিনের কর্তব্য।
ইদানিং মনে হয়-উদ্বাস্তু মানুষের মতো
মনের অজান্তে প্রতিমূহুর্তে
পথ হারাই একাকী।
রাত জাগা ডাহুকের মতো
অকারণে হৈচৈ-আড্ডা
কমতি নেই কোন কিছুতেই।
এ যেন পথভ্রান্ত-অর্ধউন্মাদ
এক পথচারির আহাজারী।
দুঃখ আর সুখের সাথে জড়িয়ে থাকা
অর্ধশত বছরের স্থৃতি কথা।
তবু, ভূলে গেলেও-ভূলতে পারিনি
আমাদের গ্রামের সেই নবারুন কাকার কথা।
দুই সন্তানের জনক-নবারুন কাকা ছিলেন,
সহায় সম্বলহীন একজন অতিশয় দিনমুজুর।
ঝড়-বৃষ্টি-রোদ্র-খরা মাথায় নিয়ে
দিনভর মাঠে-ময়দানে-অন্যের কাজ করে-
সন্ধ্যায় মুনিবের দেয়া সোয়া সের চাল
আর কুড়ি টাকা মাইনের বাজার নিয়ে
কলাপাতায় নির্মিত প্রাসাদে ফিরতেন তিনি।
ভূমিহীন নবারুন কাকার স্ত্রী অক্ষয়া দেবী
এতেই খুশি-খুশি দু’সন্তান ।
অন্যদিকে, গৃহকর্তী অক্ষয়া দেবী
ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে,
পাড়ার এ বাড়ি ও বাড়িতে
ঝিঁয়ের কাজ করতেন।
তিন বেলা হাড় ভাঙ্গা কাজ শেষে
পাড়ার পয়সাওয়ালা কর্তীরা-
আটার শুকনো দুটো রুটি,
কখনো বাসি পান্তা ভাত,
বাসি পোড়া ডাল-ভাতের মাড়
কখনো বা একপোয়া চাল,
কিংবা এক আধটা আলু-
মুজুরী দিতেন তাকে,
এতেই খুশি অক্ষয়া দেবী।
মাসের পর মাস, বছরের পর বছর
ঝড়-বৃষ্টি-খরা উপেক্ষা করে চলতো
নবারুন কাকা আর অক্ষয়া দেবীর সংসার।
হঠাৎ একদিন সকাল বেলা-
প্রচন্ড ঝড় বইছে বাইরে.
সারা গ্রামে জুড়ে হৈচৈ পড়ে গেলো
আহারে, ছেলে-মেয়ে দুটোর কি হাল হবে !
কে দেখবে ওদের সংসার –
কি করে চলবে ওরা ?
নবারুন কাকার দেহটির
সৎকারেও তো টাকা লাগবে !
তারপর মাসব্যাপী ক্রিয়াকার্য
অবিশ্বি, শ্রাদ্ধ, শান্তি কত্বো কি।
পাড়ার কেউ কেউ বলছে-
আহারে-নবারুনটা না মরে
অক্ষয়াটা মরলো না কেনো ?
সত্যি, জোয়ারের জলের মতো
মানুষের আসা যাওয়া,
নবারুনটার চেহারা চেনা যায় না !
এদিকে,নবারুন কাকার নিথর দেহ
পড়ে আছে উঠোনের মাঝখানে-
চলছে অক্ষয়া দেবী আর
ছেলে-মেয়ের করুণ বিলাপ।
ও পাশে, পাড়ার কয়েক যুবক
বৃষ্টিতে ভীজে সৎকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে
আর বলছে, কান্না করে কি হবে ?
যে যাবার সে যাবেই,
এবার হাতের শাঁখা ফলা ভেঙ্গে
কপালে থাকা স্বামীর দেয়া সিঁদুর
উঠিয়ে ফেলুন বউদি-
কেঁদে কোন লাভ নেই।
যে ভাবে ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে
পাড়ায় লাখরির খুব অভাব,
লাশ শ্বশানে নিয়ে যেতে হবে
তারপর,বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে
নবারুন কাকার সৎকার করতে
চলুন সবাই, চলুন চলুন।
তারপর, যা হবার তাই হলো।
##
Leave a Reply