ছোটবেলায় একজন আমার হাত দেখে,চমকে উঠে বলেছিল,ওমা… একি! এই মেয়ের তো দেখছি অল্প বয়সেই “বৈধব্যযোগ” আছে! আমি ছোটো, তাই “বৈধব্য” শব্দটি বুঝতে পারিনি৷ কিন্তু যখন বড় হলাম, “বৈধব্য” শব্দটির অর্থ জানতে পারলাম, ভয়ে হৃৎপিন্ড কেঁপে উঠল! কিন্তু এটা কেবল কুসংস্কার বলেই সান্ত্বনা দিয়েছি মনকে। নবম শ্রেণি থেকেই একজনের প্রেমে ডুবেছিলাম।
ওর নাম “অর্পণ” যখন কলেজে ভর্তি হলাম,তখন
“তার” সঙ্গে আমার বিয়ের কথা হচ্ছিল,” অর্পণ” কে বলেছিলাম। জানো, খুব ছোটবেলায় আমায় একজন বলেছিল…আমার নাকি বৈধব্যযোগ আছে।
এটা শোনা পর “অর্পণ” হেঁসে বলেছিল।
তুমি খুব বোকা “দীপা” আচ্ছা এখন এইসব কেউ বিশ্বাস করে? আর যদি এমন হয়ও, তাহলেও তো শান্তি, কারণ, তোমায় ভালোবেসে,তোমার সঙ্গে বিবাহ পর,আমি যদি মরেও যাই, আমার অাক্ষেপ নেই। তবুও আমার তোমাকেই চাই৷
তারপর আমাদের মহাসমারোহে বিবাহ হয়ে গেলো।
“অর্পণ” এত সুন্দর মানসিকতার মানুষ। আমি নিজ ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এত ভালোবাসায়,সম্মানে, বেশ সুখে,শান্তিতে সোনার সংসার চলছিল আমাদের, ভীষণ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, “তার” সঙ্গে কখনো আমার ঝগড়া হয়নি।এত কিছু দেখে, শুধু আমার মনে হতো, আমি এত সুখের যোগ্য নই। কখনো হয়তো ভীষণ কোন ঝড় এসে সমস্ত কিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। এই ভয়ে আমার বেশ অশান্তি সৃষ্টি হতো মনেও মস্তিষ্কে। কিন্তু আমাদের ঘরে আমার প্রথম কন্যা সন্তান এলো। খুশী যেন আরো দ্বিগুণ বেড়েই চলেছিল।
হঠাৎ এক দুপুরে, আমার মনটা ভীষণ খারাপ ছিল,
মনে হচ্ছিল আজ কোন অশান্তি সৃষ্টি হতে চলছে। ঠিক তখনি খবর পেলাম। “অর্পণ” নেই!এক্সিডেন হয়েছে। আমি মর্মে মর্মে বুঝতে পারলাম, ছোটবেলার সেই বৈধব্যযোগ সত্যিতে পরিনত হলো।
কতটা যন্ত্রণার ছিল সেই বৈধব্য জীবন। একটা সময় আমি আর নিজের মধ্যে ছিলাম না,প্রায় পাগল হয়ে ছিলাম। তাকে ভোলা সম্ভব নয়,একদিন যাকে না দেখলে, কথা না হলে, আমার নিঃশ্বাস থেমে যেতো।
সে এখন কতদূরে, দিন কয়েক পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম। “অর্পণ” মারা যাবার পর, ওদের বাড়ির সবাই আমায় আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
সেই থেকে মেয়েটার জন্য বেঁচে থাকার চেষ্টা করলাম।
আমি পড়াশোনা চলছিল, তখন অণার্স ১ম বর্ষে, ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু “ভাগ্য চক্র” এখানেই। একদিন ক্লাসে একজনকে দেখে চমকে উঠলাম!
ওর নাম “সীমান্ত” যার প্রেম নিবেদনকে আমি স্কুলে থাকতে সোজাসাপ্টা “না” বলেছিলাম।
সেদিন “সীমান্ত” আমাকে বলল,
আরে তুমি দীপা,এখানে? ও আমায় এতদিন পর দেখে বেশ খুশী, শুধু প্রশ্ন করছিল, আমি উত্তর দিচ্ছিলাম, একসময় বলল, তুমি তো বেশ সুখে আছো,ভালো করেছো তাড়াতাড়ি বিয়ে করেছো, আবার মা হয়ে গেছো। তাড়াতাড়ি শাশুড়ীমা হতে পারবে৷
আমি ওর সব কথায় হ্যাঁ, বলেই চলে এলাম।
“সীমান্ত” আবারও একদিন খুব দুঃখী স্বর্রে প্রশ্ন করেছিল,তোমার হাসবেন্ড মারা গেছে, তা আমায় সেদিন বলোনি কেন? আমি খুব স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলাম, ইচ্ছে হয়নি তাই৷ সেদিন আমায় খুব সান্ত্বনা দিয়েছিল।
মাঝে মধ্যে আমার মেয়েকে ক্লাস করতে নিয়ে গেলে, “সীমান্ত” ওর কাছে রাখতো, আমায় সব সময় মনকে শান্ত রাখার উপদেশ দিতো৷ মনে হলো ও আমায় অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছে। আমি সেটা বুঝে,
একদিন আমি বললাম,
“সীমান্ত” আমি কখনো আমার জীবনে ২য় বার কাউকে আসতে দেবো না। তোমার কিন্তু আমার থেকে দূরে থাকাই ভালো৷ তাছাড়া আমি আমার মেয়েকে নিয়ে ভালো থাকবো। তোমার এত এত স্বজনপ্রীতি না দেখালেও চলবে।
“সীমান্ত” সেদিন আমায় বলেছিল, জীবন একটাই, তাই
আমায় তোমার ২য় বার….
“সীমান্ত” এর কথা থামিয়ে বলেছিলাম, থাক,,,তোমার আর কিছু বোঝাতে হবেনা।
প্রায়,মাস কয়েক ধরে ওর সঙ্গে কথা বলিনি। কিন্তু “সীমান্ত” আমায় এতটা মানসিক সাপোর্ট দিয়েছিল।
যার কারণে মনের অজান্তেই ২য় বার আমি আমার
মনে প্রেমে দেখতে পেলাম। সব সময় কেবল “সীমান্ত” র নিকট গেলেই শান্ত হয়ে যেতাম। ধীরে ধীরে বুঝলাম, আমি শুধু প্রেমে নয়, পুরোপুরি ভালোবেসে ফেলেছিলাম৷ কিন্তু” অর্পন” এর কথা মনে এলে,মুহুর্তে সব কিছু ভুলে দুঃখে নিমজ্জিত হতাম। মনে হতো,
এট অন্যায়, এই মনে অর্পণের স্থানে, আর কাউক রাখা যাবে না। “সীমান্ত” একদিন আমায় রজনীগন্ধার ফুল এনে বলেছিল, “দীপা” তুমি সাজসজ্জা কেন করো না?
এই নাও এই ফুল অবশ্যই তোমার কাছে রাখবে।
আমি কাঁপা কন্ঠে বলেছিলাম,
আমি?
হ্যাঁ,
কিন্তু?
কি?
বিধবা নারী সাজসজ্জা করতে নেই।
সেদিন “সীমান্ত” বলেছিল,
তোমায় বিধবা সেজে, থাকতে হবেনা, আমায় একবার বিশ্বাস করো, চলো আমরাও একটা সংসার শুরু করি।
তোমার কতই বা বয়স? দেখেছো? আমাদের ক্লাসে বহু মেয়ে অবিবাহিত, তাহলে তোমার ২য় বার সংসার করতে আপত্তি কোথায়?
আমি কয়দিন পর “সীমান্ত” কে বলেছিলাম, তুমিই বা কেন?একটা বিধবা, মেয়েকে বিয়ে করতে চাও? জানো তো আমার একটা মেয়েও আছে।
“সীমান্ত” সেদিনও ভরসার চোখে বলেছিল, ভালোবাসি, সত্যি ভালোবাসি৷
আমি মুহুর্তেই অত্যন্ত রেগে উত্তর দিয়েছিলাম৷
নাহ্ আমি তোমায় ভালোবাসি না। তাহলে আমার মৃত হাসবেন্ড যে আমায় খুব খারাপ বলবে,
“সীমান্ত” তখন বুঝিয়ে বলেছিল,
তোমার জীবনকে ২য় বার একটা সুযোগ দিলে, তোমার “অর্পণ”তোমার উপর রাগ করবে না।
বরং তুমি দুঃখে থাকলে উনি তোমার জন্য কষ্ট পাবে।
তাছাড়া তোমার মেয়েটার তো একটা ভবিষ্যত আছে।
আমি কয়দিন ধরে ভেবে বলেছিলাম, ঠিক আছে, আগে অণার্স টা শেষ হোক তারপর। “সীমান্ত” সেটাও মেনেনিয়েছিল।
কিন্তু এর মাঝে,এতটাই অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটবে, ভাবিনি। অণার্স ৩য় বর্ষে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম,
শেষ পরীক্ষার দিন বাড়ি এসে দেখলাম, আমার মেয়েটা জলে ডুবেছিল,আর সে বেঁচে নেই। তখন আমি দ্বিগুণ কষ্টে পাথর হয়েছিলাম। সে বছর আর পড়াশোনা হয়নি। পর পর দুটি শোক মনের উপর ভীষণ দাগ কেটেছিল।
তখন “সীমান্ত” আমার জন্য বিশাল মানসিক শান্তির কারণ। ও বলল, তুমি এভাবে শুধু দুঃখে ভেসে যাবে? কেন আমি তোমার দুঃখের ভাগ নিতে পারিনা?
বললাম, যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসো,তাহলে অপেক্ষা করো৷
প্রায় ২ বছর পর, পর আমরা নতুন সংসার শুরু করি।
কিন্তু হঠাৎ আমার মেয়েটার মুখ ভেসে উঠে, ঠিক মতো জীবন যাপন করতে পারছিলাম না।
“সীমান্ত” আমায় আবার আগের মতোই সুন্দর জীবনে ফেরাতে শুরু করেছিল। যদিও “অর্পণ” এর মতো এত টাকা পয়সা “সীমান্ত” র ছিলনা, কিন্তু সুন্দর মানসিকতা ছিল দুজনের একই।
কিন্তু আমার “ভাগ্য চক্র” এমনি। দুই বছর যেতে না যেতেই,”সীমান্ত” ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলো। তখন আমি একা, এই শোককে একান্ত আপন করে, হৃদয়ে জমাটবদ্ধ তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে ছিলাম।
লোকজন আমায় কটু-বাক্য বলতে ছাড়েনি। অবশ্য ছাড়বে কেন? ঠিকই বলেছে সবাই,সুখ আমার জীবনে স্থায়ী হয়না। পর পর দুবার বিধবা হলাম। সন্তান টা চলে গেলো। জীবনের সমস্ত শান্তি অন্ত,তাই আমি বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিলাম৷
একদিন এক অনাথ ছেলে এসে আমার আচঁল টেনে ধরে বলল,,মা,, তখন ওর মা ডাক শুনে আবার আমার মা হয়ে ইচ্ছে হলো। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হলো।
তাই,ছেলেটিকে নিজ সন্তানের মতো মানুষ করলাম। কিন্তু, বছর যেতে না যেতেই, ছেলেটি আমায় ছেড়ে হারিয়ে গেলো। বহু খুঁজেও তাকে পেলাম না। ওকে ভালোবেসে খোকা বলে ডাকতাম। সেই খোকা আমার নিকট থাকেনি। ওর আসল মাকে পেয়ে আমায় ভুলে গেলো।
“ভাগ্য চক্র” বড়ই অদ্ভত !
সমাপ্ত
অনেক সুন্দর