সমাজে আজও চোখে পড়ে খোলা জায়গায় অস্থায়ী ঘর স্থাপন করে বসতি গড়া একদল জনগোষ্ঠীকে ! যারা আমাদের কাছে ‘বেদে’ নামে পরিচিত। আচরণে ও পেশায় ভিন্নতা থাকলেও বেদেরা এ দেশের নাগরিক এটা অস্বীকার করার উপায় নেই কারো। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভোটাধিকারসহ রাষ্ট্রীয় সব নাগরিক সুবিধা তাদের প্রাপ্য থাকলেও প্রায় এই জনগোষ্টি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। বিভিন্ন অযুহাতে দীর্ঘদিন এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলো এই বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী। তবে একজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা ডিআইজি হাবিবুর রহমানের আপ্রাণ চেষ্টায় এ জনগোষ্টির মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করায় সমাজ পরিবর্তনে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।
চিকিৎসা ব্যবসা ও ওষুধ বিক্রিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে নিজস্ব ভাবধারায় রচিত হতো বেদেদের জীবন। গত দুই দশক আগেও বেদে সম্প্রদায়ের যে অবস্থা ছিলো, আজ তা নেই। আধুনিকতার ছোঁয়া তাদের সমস্ত জীবন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। যাযাবর বৃত্তি পরিহার করে স্থায়ী বসতির চিন্তা এখন সব বেদে সম্প্রদায়ের স্বপ্ন। শিশু শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধিসহ গাওয়ালি (ভ্রমণরত) বেদেদের নানামুখী পরিবর্তন এখন দৃশ্যমান।গাওয়ালে আসা বেদে পরিবারের শিশুরা এখন স্কুলগামী হতে চলেছ।

বাংলাদেশে ক্রমেই বিলুপ্তপ্রায় একটি জনগোষ্ঠী বেদে। বেদে মানেই ভ্রমণশীল বা ভবঘুরে। গত ৪/৫ বছর আগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসেব মতে এ দেশে বেদেরে সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ হলেও ক্রমে ক্রমে তা কমতে চলেছে। সময়ের পরিবর্তনে বেদেদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষা ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে বদলে নিয়েছে তাদের পেশা ও পরিচয়। চাল-চুলোহীন জীবনের ইতি টেনে স্থায়ী বসতিতে বসবাসের ইচ্ছা অধিকাংশ বেদে পরিবারের নিত্যদিনের প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। জীবনের তাগিদে বেদেরাই তাদের জীবনে ঘটিয়েছে নানামুখী পরিবর্তন। সামাজিকতার অনুকরণে এসেছে চাল-চলনের পরিবর্তন। কেউবা অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে স্থানান্তর হয়েছে নতুন সামাজিকতায়।
বেদেদের সার্বজনীন পেশা ছিলো চিকিৎসা ব্যবসা ও ওষুধ বিক্রি। নানা রকমের বুনো শেকড়, লতাপাতা এরা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। এদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে ঝাড় ফুঁক অর্থাৎ মন্ত্রের প্রয়োগ অত্যন্ত বেশি। বাত ও দাঁতের ব্যথার চিকিৎসা, শিশু চিকিৎসা, মালিশ প্রভৃতিতে বেদেরা অভিজ্ঞ বলে বিশ্বাস প্রচলিত ছিলো। বর্তমানে বেদে চিকিৎসা গ্রহণে আধুনিক সমাজ অধিকতর সজাগ ও সচেতন। গ্রামীণ সমাজেও এখন আর বেদে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা নেই। তাইতো বেদেরা বাধ্য হয়েই পেশা পরিবর্তন করে চলছে প্রতিনিয়ত। পুরানো এই পেশা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নতুন পেশা খুঁজে নিয়েছে অনেক বেদেরাই। গ্রামে ঘুরে ঘুরে অনেক বেদেরাই ফেরি করে বিক্রি করছেন সিরামিক পণ্য, বাচ্চাদের খেলনা, মহিলাদের শাড়ী কাপড়।
বেদেরা সাধারণত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে গ্রামে গঞ্জে ভ্রমণ করতেন। এই ভ্রমণকে তাদের ভাষায় বলে ‘গাওয়াল’। উপকূলীয় জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশালসহ ঢাকার পাশ্ববর্তী সাভার, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ জেলায় একাধিক অস্থায়ী বেদে পল্লীরে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে যানা গেছে, বেদেদের ব্যবসায়িক পরিবেশ আস্তে আস্তে মন্দা হয়ে আসছে। তাই তারা গাওয়াল জীবন ছেড়ে অন্য কিছু করার চেষ্টা করছে। তারা এখন স্থায়ী জমি কিনে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করছে। স্থায়ী নিবাসের ব্যবস্থা বাড়ায় পরিবর্তন হয়ে আসছে তাদের জীবনপ্রবাহ।

গত এক দশক আগে বেদে পল্লীতে দেখা যেতো, কুপির আলোই ছিলো তাদের একমাত্র ভরসা। তবে বর্তমানের গাওয়ালি বেদে পল্লীতেও দেখা যায়, সৌর প্ল্যানেট ব্যবহার করে তারা ডেরায় বাতি জ্বালায়। সোলার বাতির ব্যবহার বেদেদের জীবন পরিবর্তনের আরো একটি উদাহরণ।
সমগ্র সমাজব্যবস্থা উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও আধুনিকায়ন ঘটেছে। বৃদ্ধি পেয়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বেদেদের প্রতিটি পরিবার এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। প্রতিটি ডেরায় স্বামী-স্ত্রী দুজনের না হলেও কমপক্ষে একজন মোবাইল ব্যবহার করে।
বেদেরা সাধারণত গাওয়ালে বের হলে নৌকা ব্যবহার করত। নদী নির্ভর বাংলাদেশে বেদেদের প্রধান বাহন ছিলো নৌকা। নৌকায় সংসার নিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো ছিলো এই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য। এখন বেদেরা গাওয়ালে বের হলে নৌকার ব্যবহার ততটা করে না। বর্তমানে স্থান বদলে ব্যবহার করে সড়ক পথ। বাসের ছাদে প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য মালামাল তুলে নিয়ে তারা চলে আসে দূর-দূরান্তে কিংবা বহরের সবাই মিলে অটো ইজিবাইক বা মিনি ট্রাক ভাড়া করে চলে যায় তাদের গন্তব্যে। তাদের জীবন ব্যবস্থায় নৌকার উপস্থিতি এখন আর নেই বললেই চলে।
সামাজিকতার পিছিয়ে নেই বেদে সমাজ। আনুমানিক এক দশক আগেও বেদে পল্লীতে ছিলো না ততটা সামাজিকতার ছোঁয়া। তবে এখনকার বেদে বহরে বাইরের কোনো অতিথি গেলে তাকে চেয়ারে বসানোর ব্যবস্থা করে। খাবারের আপ্যায়ন করে। তাদের শিশুগুলোকে মেলামেশা করতে দেয় সবার সঙ্গে। সব আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে সমাজকে গতিশীল করতে তাদের জীবনেও এসেছে সামাজিকতা। আর এজন্য বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশ পুলিশের কয়েকজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা, গুটিকয়েক এনজিও প্রতিষ্টানের সচেতনতা মূলক কার্যক্রম করার কথা বলে থাকেন। সেই সাথে তাদের স্ব-ইচ্ছাতো রয়েছেই।
এধরনের একাধিক পরিবর্তন সাধিত হলেও তাদের জীবন এখনও অমানবিক। বেদেরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নেই নাগরিক অধিকার লাভের পন্থা। জন্ম নিবন্ধন করা হয় না বেদে বহরের শিশুদের। জন্মের পর টিকা দেওয়া হয় না এসব শিশুদের। বহরের কাছাকাছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও স্কুলের বারান্দায় ওরা যেতে পারে না বা যায় না। এমন অবস্থা এখনো বিরাজ করছে বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ জেলাগুলোতে বসবাসরতদের মধ্যে। বেদে সম্প্রদায়ের শিশুরা সারাক্ষণ দুরন্তপনায় দিন কাটায় তাঁবুর আশেপাশে। ফলে শিক্ষার আলো থেকে প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে ওরা। শিক্ষা বিচ্ছিন্ন এসব শিশুরা দেশের বোঝা হয়ে বেড়ে উঠছে। এই উপলব্ধি কেবল সুশীল সমাজের নয়। খোদ বেদে পরিবারগুলোও বোঝে তাদের শিশুদের আগামীর করুণ পরিণতি। তবে কিছুটা হলেও শিশু শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে বেদে পরিবারগুলো। পরিবারগুলো আজকাল প্রতিটি সন্তানকে না হলেও, মেধা বিবেচনায় দুই-একজনকে পড়ালেখা শেখাচ্ছে। গাওয়ালে বেড় হলেও তারা সব সন্তানকে সঙ্গে নেয় না। সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে বেদেরা এখন চিন্তা করে।
এব্যাপারে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করা মানেই জীবন ব্যবস্থার উন্নতি নয়। অন্য পেশা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বেদেরা ভিক্ষাবৃত্তির মতো পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। বিয়ের সাহায্য চেয়ে দল বেধে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেদেরা।
সমাজের অঙ্গ হিসেবে বেদেদের বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেদে জীবন ও জীবিকায় বংশগত পেশার টান আস্তে আস্তে নাজুক হয়ে এসেছে নানা কারণে। ফলে তাদের জীবন ব্যবস্থায় এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। বেদেদের জীবন ব্যবস্থায় পরিবর্তন, দেশের সার্বিক উন্নয়নের একটি প্রতিচ্ছবি।
তার একটি চিত্র নজরে পড়ে গাজীপুর মহানগরের ৪০ নং ওয়ার্ডের জয়নগরে বেদে পল্লীতে অপরাধ দমনে সকলকে সচেতন করার লক্ষ্যে পূবাইলে থানা পুলিশের উদ্যোগে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে আলোচনা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পূবাইল থানার অফিসার ইনচার্জ মহিদুল ইসলাম। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ দক্ষিণ বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার ইলতুৎ মিশ।
তিনি বলেন মাদক খুব খারাপ জিনিস মাদক একটি পরিবার কে ধ্বংস করে দেয়, আপনাদের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাতে হবে। যাতে করে আমাদের মত সরকারি চাকরি করতে পারে।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন,উপ সহকারী পুলিশ কমিশনার হাসিবুর রহমান, ৪০নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আজিজুর রহমান শিরিষ, আওয়ামীলীগ নেতা সোলেমান মোল্লা, যুবলীগ নেতা খান শামীম প্রমুখ। প্রশাসনের এমন সচেনতামূক উদ্যোগ বেদে সম্প্রদায়ের জীবন মান এবং চলার পথকে আরো সূদীর্ঘ করবে এমনটাই প্রত্যাশা বেদে সম্প্রদায়ের নারী পুরুষদের।
Leave a Reply