রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন

হেলেনা, মৌ, পিয়াসা, ঈষিতাদের প্রতারণার শেষ কোথায় ?

মৃণাল চৌধুরী সৈকত
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১
  • ১৫৬ বার

হেলেনার ৪ সহযোগী যুবককে খুঁজছে পুলিশ :
আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্যপদ থেকে বহিষ্কৃত হেলেনা জাহাঙ্গীরের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত আরও তিন নারী ও চার যুবককে পুলিশ খুঁজছে। তাদের মাধ্যমেই হেলেনা চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেলিং ও গুজব রটানোর মতো অপকর্ম করতেন। অন্যদিকে, হেলেনার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ভোলার সাংবাদিক আবদুর রহমান তুহিন। গতকাল ঢাকা মহানগরের পল্লবী থানায় মামলাটি করেন তিনি। এদিকে, পল্লবী থানার মামলার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ ইসলাম বলেন, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আবদুর রহমান তুহিন নামে এক সাংবাদিক চাঁদাবাজি ও প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা করেছেন। মামলা নম্বর ৯।এই নিয়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় দুটি মামলা হলো। অনুমোদন ও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া জয়যাত্রা টিভির সম্প্রচারের অভিযোগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন আইনে র‌্যাব-৪-এর একজন উপপরিদর্শক (এসআই) গত শুক্রবার রাতে প্রথম মামলাটি করেন। দুটি মামলারই তদন্ত চলছে। মামলা সূত্রে জানা যায়, জয়যাত্রা টেলিভিশনের ভোলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার নামে টেলিভিশনটির চেয়ারম্যান হেলেনা জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা দেড় লাখ টাকা নিয়েছিলেন। তবে প্রতিনিধি হিসেবে ক্যামেরাসহ যেসব সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল তাকে, সেগুলো দেওয়া হয়নি। উল্টো তার কাছ থেকে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। টাকা ফেরত চেয়ে বিভিন্ন সময় হেলেনা ও তার সহযোগীদের ফোন করলেও তারা হুমকি-ধমকি দিয়েছেন

পিয়াসার অধীনে ১০০ সুন্দরী বললেন আইনশৃংখলা বাহিনী :
মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার অধীনে ছিল ১০০ সুন্দরী। তাদের দিয়ে ধনীর দুলালদের নিজের ফাঁদে ফেলতেন পিয়াসা। ব্ল্যাকমেলিং করে দিনের পর দিন তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। বারিধারায় আড়াই লাখ টাকার অভিজাত ফ্ল্যাটে বসবাস, কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা আলিশান জীবনযাপনের জন্য এর বাইরে তার কোনো আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো তথ্য পায়নি তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্যদিকে, পিয়াসার অন্যতম সহযোগী গ্রেফতার মরিয়ম আক্তার মৌ-ও একই কায়দায় ধনীর দুলালদের ব্ল্যাকমেলিং করার তথ্য পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রাতে বাসায় পার্টির নামে বিত্তবান পরিবারের যুবকদের ডেকে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও করে প্রতারণাই ছিল তাদের অন্যতম পেশা। রবিবার রাতে গ্রেফতারের পর পিয়াসা এবং মৌ দুজনকেই পৃথক দুটি মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছেন দুই তদন্তকারী কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনোদনজগতে প্রতিষ্ঠা না পেয়ে মূলত টিকে থাকার জন্যই বিপথগামী হয়েছেন পিয়াসা এবং তার সহযোগীরা। কেউ ভয়ংকরভাবে মাদকাসক্ত হয়ে হারিয়েছেন সৌন্দর্য্য। কারও বিরুদ্ধে হচ্ছে মাদক কারবারের মামলা। প্রতারণা বা নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মডেল-নায়িকার বাসায় অভিযান চালাতে গেলেই পুলিশ পাচ্ছে ইয়াবা, মদসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। মৌ তার বাসায় মিনি বার বানিয়ে মাদকদ্রব্য বিক্রি করছিলেন। রবিবার ছিল পিয়াসার জন্মদিন। জন্মদিনের পার্টির জন্য তিনি এবং তার সহযোগীরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে এর আগেই তার বাসায় হাজির হয় পুলিশ।
এর আগে গত শনিবার রাতে একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা সিমন হাসান একার রামপুরার উলনের বাসায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, গাঁজা ও মদ উদ্ধার করে পুলিশ। গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে একার বাসায় গিয়েছিল পুলিশ। ডিবির যুগ্ম কমিশনার (উত্তর) হারুন অর রশীদ বলেন, পিয়াসা ও মৌ দুজনই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। এদের অধীনে রয়েছে ১০০-১৫০ সুন্দরী রমণী। টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের পেছনে লেলিয়ে দিয়ে তাদের বাগে আনতেন তারা। পরে হাতিয়ে নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা। মান-সম্মানের ভয়ে ওই ব্যক্তিরা কারও কাছে মুখ খুলেননি। পিয়াসা এবং মৌ-এর ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখা হবে।

ঢাকার লেডি মাফিয়া গ্যাং লিডার মৌ’রা যখন মৌরানী :
চক্রটি লেডি মাফিয়া গ্যাং নামে ঢাকা শহরের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন মরিয়ম আক্তার মৌ। গত রোববার রাতে মৌয়ের মোহাম্মদপুর বাবর রোডের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, ইয়াবা আর সিসা উদ্ধার করা হয়েছে। তার বাসায় প্রায় প্রতিদিনই মদের আসর বসে। আর এ আসরের মধ্যমণি হয়ে থাকেন মৌ। তার গ্রুপে রয়েছে অসংখ্য নারী।

চট্টগ্রামের একটি পার্টিতে পিয়াসার সঙ্গে পরিচয় হয় মরিয়ম আক্তার মৌয়ের। সেখান থেকেই ঘনিষ্ঠতা। ধীরে ধীরে পিয়াসার নেটওয়ার্কে বিচরণ ঘটে তার। পিয়াসার পরামর্শে মাঝে মাঝেই ২২/৯, বাবর রোডের বাসায় আসর বসাতেন মৌ। অনেকটা মিনিবারের মতো করেই মৌ তার ড্রয়িং রুমের ডেকোরেশন করেছেন। অনেক সুন্দরীর উপস্থিতিতে সেই পার্টিতে রাখা হতো বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। অর্থের বিনিময়ে তাদের কাছে মদ, ইয়াবা, সিসাসহ অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রি করতেন। তাদের রিমান্ড আবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া ওই আসরে ধনী ও ব্যবসায়ীদের নানাভাবে ফাঁদে ফেলে ব্লাকমেল করতেন মৌ। ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, মৌ তার নিজের বাসায় নাচ ও গানের আসর বসান। তার সঙ্গে আরও দু-তিনজন জড়িত রয়েছেন। আসামি মৌ একজন নারী মাদক ব্যবসায়ী। স্বামী একটি লিজিং কোম্পানির কর্মকর্তা। তবে তিনি স্ত্রী মৌয়ের নির্দেশনায়ই চলতেন। মৌ তার দ্বিতীয় স্ত্রী। আগের স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পরই মৌকে বিয়ে করেন তিনি। তবে মৌয়ের এটা তৃতীয় বিয়ে। গত রবিবার গ্রেফতার হওয়ার আগে মোহাম্মদপুরের বাসায় অভিযান চলার সময় গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে মৌ দাবি করেছিলেন, একটি প্রতিষ্ঠিত বিপণিবিতানের মালিকের স্ত্রীর পরকীয়ার খবর তিনি জেনে যাওয়াই তার কাল হয়েছে। তবে ওই ব্যবসায়ীর স্ত্রী তার বন্ধু ছিলেন। চট্টগ্রামের একটি অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে পরিচিত হন। যদিও তারা এখন শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। ওই ব্যবসায়ীর স্ত্রী মনে করছেন তিনি সেই খবরটি তার স্বামীর কানে দিয়েছেন। তিনি তার ফ্ল্যাটে সহযোগী মাদক ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদের নাইট পার্টির কথা বলে ডেকে এনে মাদক বিক্রয় করে যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে ধাবিত করেন। তারা পার্টির নামে উচ্চবিত্তদের বাসায় ডেকে মদ ও ইয়াবা খাইয়ে আপত্তিকর ছবি তুলে রাখতেন। পরে সেই ছবি দেখিয়ে ব্যাকমেল করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেন। পিয়াসার দেওয়া তথ্যে মৌয়ের রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসায় অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তার বাসা থেকেও বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়। পরে রাত ১টার দিকে মৌকে আটক করা হয়।
সূত্র জানায়, মৌয়ের টার্গেট ছিল ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। বিভিন্ন পার্টিতে গিয়ে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করত তারা। বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যক্তি ও তাদের ছেলেদের আমন্ত্রণ জানিয়ে গোপন ক্যামেরায় ছবি তুলে ব্যাকমেল করতেন।

সুন্দরী ডাক্তার ঈষিতা প্রতারণার ফাঁদ :
কথিত তরুণ চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ইশরাত রফিক ঈশিতা ও তার সহযোগী মো. শহিদুল ইসলাম ওরফে দিদারকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এরপরই বেড়িয়ে আসে ডা. ঈশিতার প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য। করোনা মহামারিকে পুঁজি করে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করে প্রশিক্ষক ও আলোচকের ভূমিকায় থেকে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিতেন ঈশিতা। এছাড়াও বিদেশিদের দিয়ে সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রচারণা চালিয়ে অর্থের বিনিময়ে তরুণদের আকৃষ্ট করতেন তিনি।সেমিনারে অংশ নেওয়ার জন্য জনপ্রতি ৪ হাজার টাকা ও সার্টিফিকেট দেওয়ার নামে ৩ হাজার টাকা নিতেন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

রবিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর থেকে সহযোগী মো. শহিদুল ইসলাম ওরফে দিদারসহ ঈশিতাকে গ্রেফতার করা হয়।অভিযানে ভুয়া আইডি কার্ড, ভুয়া ভিজিটিং কার্ড, ভুয়া সিল, ভুয়া সার্টিফিকেট, প্রত্যয়নপত্র, পাসপোর্ট, ল্যাপটপ, ৩০০ পিস ইয়াবা, ৫ বোতল বিদেশি মদ ও মোবাইল ফোন জব্দ করে র‌্যাব।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার হওয়া ইশরাত রফিক ঈশিতা পেশায় একজন চিকিৎসক। যিনি বিভিন্ন মাধ্যমে একজন আলোচক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, গবেষক, পিএইচডি সম্পন্ন, মানবাধিকার কর্মী, সংগঠক, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন বলে ভুয়া পরিচয় দিতেন।প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঈশিতা ভুয়া পরিচয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে করতেই ভুয়া নথিপত্র তৈরি ও প্রচার-প্রচারণা চালাতেন।

ঈশিতা ২০১৩ সালে ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। এরপর মিরপুরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি করার সময় শৃঙ্খলাজনিত কারণে তিনি চাকরিচ্যুত হন। এরপর আর কোনো হাসপাতালে তিনি চাকরিতে যোগদান করেননি। ছুটে চলেন খ্যাতির পেছনে। খ্যাতি অর্জন করতে গিয়ে তিনি তার নামের পেছনে দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। আবার বাসার সামনের একটি সাদা কালো সাইন বোর্ডে নাম দিয়েছেন কর্নেল ডা. ঈশিতা। নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন ১৬টি ভুয়া ডিগ্রি।

র‌্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রেফতার ঈশিতা চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও গবেষক হিসেবে নিজের পরিচয় দিতেন। তার ভুয়া বিশেষজ্ঞ ডিগ্রিগুলোর মধ্যে রয়েছে এমপিএইচ, এমডি, ডিও। এছাড়া ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসেবেও নিজের পরিচয় দিতেন। ঈশিতা বিভিন্ন সাইটে চিকিৎসা শাস্ত্রে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, আর্টিকেল ও থিসিস পেপার প্রকাশনা করেছেন। তিনি মূলত অনলাইনে প্রাপ্ত বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রকাশনা এডিট করে গবেষণাধর্মী প্রকাশনা তৈরি করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।সূত্র : বিভিন্ন গনমাধ্যম

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories