মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন

ইবিতে ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধার বাইরে

অনলাইন ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এটি। ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উচ্চশিক্ষার প্রসার, জ্ঞানচর্চা এবং নতুন জ্ঞান উদ্ভাবনে সক্ষম মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহের মধ্যবর্তী শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
৪৭ বছরের পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়টি অতিক্রম করেছে নানা উত্থান-পতন, সংগ্রাম ও সাফল্যের অধ্যায়। ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে মাত্র ৪টি বিভাগ, ৮ জন শিক্ষক ও ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ১৭৫ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে একের পর এক অর্জন।
তবে এত উন্নয়ন ও অগ্রগতির মাঝেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট এখনো ভয়াবহ। সর্বশেষ তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনো আবাসন সুবিধার বাইরে। বর্তমানে ছাত্রদের জন্য ৫টি এবং ছাত্রীদের জন্য ৩টি হলে আসন সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৩৫৫টি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার ৮৯৭ জন। ফলে বাকি প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাস সংলগ্ন মেস, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ শহরে নানা সমস্যার মধ্যে অবস্থান করতে হচ্ছে।
বর্তমানে ছেলেদের দুটি দশতলা হল, একটি হলের এক্সটেনশন এবং মেয়েদের দুটি নতুন হল নির্মাণাধীন রয়েছে। তবে চলমান এসব কাজ সম্পন্ন হলেও তা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ২০১৮ সালে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। ফলে সম্প্রতি তৃতীয় দফায় দেড় বছর মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় আবাসিক হল, একাডেমিক ভবনসহ ৯টি ১০ তলা ভবন এবং ১১টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি অনুষদের অধীনে ৩৬টি বিভাগে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৯৭ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১২ হাজার ৩১২ জন এবং ছাত্রী ৭ হাজার ৫৮৫ জন। এছাড়া ১৮ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১১ জন শিক্ষক, ৫০৩ জন কর্মকর্তা, ৮০ জন সহায়ক কর্মচারী এবং ১৪২ জন সাধারণ কর্মচারী কর্মরত।
এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭৪৯ জন পিএইচডি এবং ৮৫৫ জন এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে ১২৫ জন পিএইচডি ও ১০২ জন এমফিল গবেষণায় নিয়োজিত আছেন। তবে অনুষদ, বিভাগ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছায়নি বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরদিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে গাড়ি রয়েছে ৪৬টি। এর মধ্যে ৫২ আসনের নন এসি বাস ১৩টি, দ্বিতল বাস ১টি, ৩৬ আসনের এসি বাস ১টি, ৩০ আসনের এসি কোস্টার ৭টি, নন-এসি মিনিবাস ৫টি, হায়েচ এসি মাইক্রো ৫টি, জিপ ৭টি, কার ৩টি, পিক-আপ ২টি এবং অ্যাম্বুলেন্স ২টি। এছাড়াও ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য ভাড়াকৃত ১৩টি দ্বিতল বাসসহ মোট ৩৩টি বাস-মিনিবাস রয়েছে। পাশাপাশি প্রতি ঘণ্টায় বাস সার্ভিস ও ৪টি ইলেকট্রিক কার সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিবহন সেবা পাচ্ছেন না তারা।
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রাফিজ আহম্মেদ বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩ ভাগ শিক্ষার্থী আজও আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এটা শুধু পরিসংখ্যান নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। হাজারো শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। উচ্চ ভাড়া ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাদের পড়াশোনা, গবেষণা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের প্রথম শর্ত হলো : শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি। নির্মাণাধীন হলগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করে তা ব্যবহার উপযোগী করতে হবে এবং খালি স্থাপনা সংস্কার করে শিক্ষার্থীবান্ধব আবাসন নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক আবসার নবী হামজা বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন যাবৎ আবাসন সুবিধার বাইরে অবস্থান করছে, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু শিক্ষাকার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা ‘প্রতি হলে আবাসন নিশ্চিত করবে প্রশাসন’ এই স্লোগানে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। নির্মাণাধীন হলগুলোর কাজ অতি ধীরগতিতে চলছে। প্রশাসন দ্রুততার সাথে উদ্যোগ না নিলে এই সংকট আরও তীব্র হবে। মেস মালিকরা সুযোগ নিয়ে ভাড়া বাড়াচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য চরম কষ্টকর। চলমান হলগুলোর নির্মাণকাজ এ বছরের মধ্যেই শেষ করে সিট বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মেস ভাড়া নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।
শাখা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মুবাশশির আমিন বলেন, ইবিতে আবাসন সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, নির্মাণাধীন হলগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে আংশিকভাবে ব্যবহার উপযোগী করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্র্যাব বা মডুলার নির্মাণের মাধ্যমে অস্থায়ী আবাসন ব্লক তৈরি করলে ১-২ বছরের মধ্যে অতিরিক্ত শয্যা যোগ করা সম্ভব। তৃতীয়ত, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু হোস্টেল ভাড়া নেওয়া যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে বহুতল ছাত্রাবাস নির্মাণ, ডিজিটাল রুম বরাদ্দ ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ বাজেট ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। যথাযথ সিদ্ধান্ত ও সমন্বয় থাকলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় খুব শিগগিরই শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাসে পরিণত হতে পারে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও নানা কারণে আমরা সেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়েছিলাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও গৌরবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে কাজ চলছে। আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ছেলেদের একটি নতুন হল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ লাইনের বাসভাড়া ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন চারটি ভাড়াকৃত বিআরটিসি বাস ও ৪টি ইলেকট্রিক কার সংযুক্ত করা হয়েছে।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories