নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়নের অভাবে শিল্পখাতে জ্বালানির ৬০ শতাংশের বেশি অপচয় হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পখাতে আরও ৩৩ শতাংশ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে টেক্সটাইল, স্টিল ও সারের মতো সেক্টরগুলোতে উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন এসএমই উদ্যোক্তারা।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং সানেমের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
তিনি বলেন, দেশের জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান ৩৫ শতাংশের বেশি; তবে মোট গ্যাস ব্যবহারকারীর মাত্র ১৯ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও এই খাতটি গভীর অস্তিত্ব-সংকটে রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্পখাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা নীতিগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এবং এটি টেকসই শিল্পায়নের পূর্বশর্ত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ২০৩০ সালের পর দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমে আসার কথা বলা হলেও অফশোর ও অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। ফলে নিজস্ব গ্যাস ব্যবহার করা যাচ্ছে না; আমদানি নির্ভর গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে সরকার ক্রমাগত ভর্তুকি দিচ্ছে, কারণ এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। জ্বালানি খাতে দক্ষতার হার বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। দক্ষতা বাড়াতে পারলে বিদ্যুৎ-ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এছাড়া তৈরি পোশাক খাতকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বেশি গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মাস্টারপ্ল্যান থাকলেও সহায়ক নীতিমালার অনুপস্থিতি শিল্পখাতকে বিপাকে ফেলেছে। শিল্পে জ্বালানি সক্ষমতার বিষয়ে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নেই এবং খাতভেদে প্রণোদনার বৈষম্য রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, স্টিল ও বাণিজ্যিক খাতসহ সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা মতামত দিয়েছেন। জ্বালানি অডিট, লজিস্টিক সেবা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি, গ্রিড আধুনিকায়ন, বাস্তবায়ন ও যোগাযোগ-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
আলোচনায় বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের সদস্য ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তার পরে জ্বালানি নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি-নির্ভরতা বাড়লে ব্যবসার খরচ ক্রমাগত বাড়বে। গত অর্থবছরে জ্বালানি খাতে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আমদানি হয়েছে ফলে দেশীয় বেসরকারিখাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি’র চেয়ারম্যান ড. এম. রেজওয়ান খান বলেন, বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পরিবর্তন না হলে খাতের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পিক ও অফ-পিক সময়ে বিদ্যুতের মূল্য ভিন্নভাবে নির্ধারণেরও প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের তেল ক্রয়ের পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন বলেন, শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ পৌঁছানোকে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ার কারণে প্রায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিসিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, এলপিজি শিল্পখাতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে; কিন্তু কোনও প্রণোদনা নেই, বরং প্রায় ১০ শতাংশ কর আরোপ রয়েছে।
বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, গ্যাস উত্তোলন কমলেও চাহিদা বাড়ছে এবং প্রতিবছর জ্বালানির চাহিদা ২০ শতাংশ বাড়ছে। জ্বালানি-সংক্রান্ত নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়ন আশানুরূপ নয়। শিল্পখাতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ হওয়ায় এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জি. মো. সিরাজুল মাওলা বলেন, দেশে প্রায় ২ হাজার ৩০০ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উদ্যোগ নিলে ৭০০-৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এজন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। লাইসেন্স-সংক্রান্ত হয়রানি দূর করতে সরকারের হস্তক্ষেপও জরুরি।
বিজিএমইএ সহ-সভাপতি বিদিয়া অমৃত খান বলেন, জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ৪ শতাংশ যেখানে বৈশ্বিক ক্রেতারা এ বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নীতিসহায়তার ঘাটতি ও অর্থায়নের জটিলতা বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
ইডকলের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মনিরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নে গ্যাপ রয়েছে, যা শিল্পখাতের সমস্যাকে প্রকট করছে। জ্বালানি খাতে অর্থায়ন নিশ্চিতে গ্রিন বন্ড চালুর পরামর্শ দেন তিনি।
মুক্ত আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী, প্রাক্তন পরিচালক এম. বশিরউল্ল্যাহ ভূঁইয়া এবং সদস্য এম. এস. সিদ্দিকী অংশ নেন।
ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন
Leave a Reply