নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। নতুন বছরের প্রথমদিনে শিক্ষার্থীরা ‘বই উৎসব’ উদযাপনের মধ্য দিয়ে নতুন বই পেয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে। তবে এবার হচ্ছে না কোন ‘বই উৎসব’, এখনও ছাপানো হয়নি অধিকাংশ পাঠ্যবই।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৪০ কোটির বেশি। এর মধ্যে গত শনিবার পর্যন্ত পৌনে ৫ কোটি বই উপজেলা পর্যায়ে পাঠানোর জন্য ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। যদিও তিনটি করে নতুন বই (বাংলা, ইংরেজি ও গণিত) দিয়ে শিক্ষাবর্ষ শুরু করার পরিকল্পনা করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। কিন্তু বই ছাপার যে পরিস্থিতি, তাতে সেই পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
মুদ্রণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত এই সময়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের সব বই ছাপানো শেষ হয়ে থাকে। কিন্তু এবার বেশ কিছু শ্রেণির বইয়ের ছাপার কাজ এখনও শুরু হয়নি। বাজারে পর্যাপ্ত কাগজের অভাব, যা একধরনের কৃত্রিম সংকট বলে দাবি করা হচ্ছে, বই তৈরির কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। বছরের শুরুতে কিছু বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো সম্ভব হলেও সব বই ছাপা শেষ হতে মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। ফলে জানুয়ারির শুরুতেই সব শ্রেণিতে বই সরবরাহ করা যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রাক্–প্রাথমিক পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৪ লাখের মতো। এর মধ্যে শনিবার পর্যন্ত ছাপা হয়েছে ৪ কোটি ৩৫ লাখের বেশি। ইতোমধ্যে ৩ কোটি ৪৭ লাখের মতো বইয়ের ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। এছাড়া মাধ্যমিকে (মাদ্রাসার ইবতেদায়িসহ) মোট বইয়ের সংখ্যা ৩০ কোটি ৯৬ লাখের মতো। এর মধ্যে শনিবার পর্যন্ত ১ কোটি ৩২ লাখের মতো বইয়ের ছাড়পত্র হয়েছে।
তবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান জানান, ছাপা বইয়ের সংখ্যা আরও বেশি। দুই দিনে আরও বিপুলসংখ্যক বইয়ের ছাড়পত্র হয়ে যাবে।
এদিকে নতুন বই পাওয়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ এবং উৎসাহও জড়িত থাকে। শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বই না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য হতাশার কারণ হতে পারে। ফয়জুর রহমান আইডিয়াল ইনস্টিটিউটের ১ম শ্রেণির ছাত্রী আলিশা ইসলাম আম্বরিনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে সে চ্যানেল 24- অনলাইনকে বলে, আমি এ বছর প্রথম শ্রেণিতে উঠেছি। বছরের প্রথমদিন আমাদের বই দেয়ার কথা থাকলেও দিচ্ছে না, এ জন্যে আমার অনেক মন খারাপ।
ওয়াইডাব্লিউসিএ উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী আদিফা আফসিন বলেন, এ বছর বই উৎসব হবে না শুনে আমরা কিছুটা হতাশ হয়েছি। বছরের প্রথম দিন বই হাতে পাওয়া আমাদের মধ্যে নতুন উদ্দিপনার পাশাপাশি পরীক্ষার আগে সিলেবাস শেষ করতেও সহায়তা করে। ফলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রভাব পরবে বলে মনে করছি।
এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে ফিউচার জেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সিনিয়র শিক্ষিকা মাহফুজা খানম মৌ চ্যানেল 24- অনলাইনকে বলেন, নতুন বই পেলে শিশুদের মন আনন্দে ভরে যায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবার শিক্ষার্থীরা বই না পেয়ে হতাশ হবে। প্রতিটি শ্রেণির বইয়ের কিছু অধ্যায় পরিমার্জন ও পরিবর্তন করার কারণে শিক্ষকদের সিলেবাস, মানবণ্টন ও ক্লাস সম্পর্কিত প্রস্তুতি নিতে বিলম্ব হবে। কারিকুলামের পরিবর্তন সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা না থাকায় বার্ষিক পাঠদান পরিকল্পনাও ব্যহত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীরা যেভাবে মোবাইল, ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পরছে, বই বিতরণের বিলম্ব এতে আরো বেশী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছি। বিগত বছরগুলোর প্রচলিত নিয়মে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌছানো সম্ভব না হলে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্কুলটির কো-অর্ডিনেটর সায়েকা মাহমুদ বলেন, বই যদি দেরিতে পাওয়া যায়, তাহলে এক বছরের শিক্ষাক্রম কম সময়ে শেষ করতে হবে। এতে শিক্ষকদের যেমন চাপ নিতে হবে, তেমনিভাবে শিক্ষার্থীদেরও অধিক চাপের সম্মুখীন হতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী চাপ নিতে পারবে না, তারা শিখন ঘাটতিতে পড়বে।
বই উৎসবের মাধ্যমে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয় ২০১০ সালে। তবে বিগত দু-তিন বছর শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ১ জানুয়ারি উৎসব করে বই বিতরণ শুরু হলেও কিছু ক্ষেত্রে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব নতুন বই দেয়া যায়নি। আসন্ন শিক্ষাবর্ষে উৎসব করে বই দেয়া হবে না।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল হয়েছে। এক যুগ আগে তৈরি পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সে জন্য এবার বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এনসিটিবি ৪৪১টি বই পরিমার্জন করে। এ প্রক্রিয়ায় পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছুসংখ্যক গদ্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা বা বিষয়বস্তু বাদ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন করে স্থান পাচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তুসহ নতুন কিছু গল্প-কবিতা। পুরোনো শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ায় এবার মোট বইয়ের সংখ্যাও বাড়ছে।
Leave a Reply