তিনি এসপি হারুন আর এখন ডিবি হারুন বা ভাতের হোটেলের ম্যানেজার হিসাবে সারাদেশে পরিচিত। পুলিশের এক আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০০০ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশ বিভাগে চাকরি নেন। কিন্তু তার বাবা হাসিদ ভূঁইয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জাতীয় সংসদের তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদের প্রভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় জায়গা পান হারুন অর রসিদের বাবা হাসিদ ভূঁইয়া।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কারীকে গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ডিবি হারুন বলেছিলেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য হেফাজতে নেয়া হয়েছে। তখন এ নিয়ে সমালোচনা হয়। দেশের প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবিগণ ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে তাদের মুক্তি দাবী করেন। তখন ডিবি হারুনকে হাইকোর্ট বলেছিলেন, জাতির সাথে মশকরা বন্ধ করেন।
এ ঘটনার পর শেষবারের মতো আলোচনায় আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তা অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ। এবার সমোলোচিত এ সাবেক ডিবি প্রধান বিসিএস চাকরিতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সামনে এসেছে অবৈধ উপায়ে অর্জিত শত শত কোটি টাকার সম্পদ। শেখ হাসিনার পতনের পর হারুনের অপকর্মের বিষয়গুলো এখন মানুষের মুখে মুখে।
শুক্রবার (১৬ আগষ্ট) একাধিক জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গাজীপুরের এসপি থাকাকালীনই হারুনের ‘ভাগ্যবদল’ঘটে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের এসপি থাকার সময় হারুন তার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বাড়ির পাশের হাওরে জমি কিনতে শুরু করেন। নামে-বেনামে তার কমপক্ষে ১০০ একর জমি রয়েছে। আবার শতাধিক একর অন্যের জমি তার দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও হারুনের শতকোটি টাকার সম্পদ থাকার গুঞ্জন রয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হারুন অর রশীদ কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হোসেনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবদুল হাসিদ ভূঁইয়া ও মা জহুরা খাতুন। সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ চার ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। দ্বিতীয় জিয়াউর রহমান মাদক দ্রব্যের এসআই ও তৃতীয় জিল্লুর রহমান পুলিশের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া হারুনের প্রতিষ্ঠিত বিলাসবহুল ‘প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সবার ছোট ভাই শাহরিয়ার। তার প্রয়াত বাবা ঘাগড়া বাজারে চালের কারবার করতেন। হাওরের সেচ প্রকল্পেও শ্রম দিতেন।
হারুন কিশোরগঞ্জের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি উর্ত্তিন হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স (এমএসএস) করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলের ২১৩নং রুমে থাকার সময়ে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ এডভোকেটের স্নেহভাজন হওয়ার কারণে সে সময় তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
গত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি পান। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার এসে তার পদায়ন আটকে দেয়। ওয়ান-ইলেভেনের সময় হারুনের চাকরি স্থায়ী হয়।
২০১১ সালের ৬ই জুলাই সংসদ ভবনের সামনে তৎকালীন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুককে মিছিল করার সময় পিটিয়ে প্রথম সমালোচনায় আসেন তৎকালীন ডিএমপির তেজগাঁও জোনের ডিসি (অতিরিক্ত উপ-কমিশনার) হারুন অর রশীদ। তখন এ ঘটনা ছিল ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। এ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থা কুড়ান আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা। তারপর থেকে হারুনের উত্থান চোখে পড়ার মতো।
২০১৪ সালের ২৪শে আগস্ট তিনি গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পান। এর মাত্র চার মাস পর ২০১৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর গাজীপুরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জনসভায় ১৪৪ ধারা জারি এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে ওই জনসভা ভণ্ডুল করে দেন এসপি হারুন। এ ঘটনায় নতুন করে আবারো আলোচিত হন হারুন। টানা ৪ বছর গাজীপুর জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে ছিল অভিযোগের পাহাড়। ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের জিম্মি করে টাকা আদায়, জমি দখলে সহায়তা ও মদত দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সেখানকার মানুষের মুখে মুখে। তার ক্ষমতার দাপটে কোণঠাসা ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৬ সালে গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় ইউপি নির্বাচনে নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করেন এসপি হারুন। এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ২১শে এপ্রিল এসপি হারুন অর রশীদকে গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এই পুলিশ কর্মকর্তার প্রত্যাহারের আদেশ তুলে নিয়ে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয় মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে ৩রা মে গাজীপুরের এসপি পদে পুনর্বহাল করে।
গাজীপুরের এসপি থাকার সময় অবৈধ জুয়ার আসর “হাউজি” থেকে প্রতিরাতে তার অবৈধ আয় ছিল অর্ধ কোটি টাকা। এসময় গাজীপুরের কতিপয় সাংবাদিক নেতাদের অকুন্ঠ সমর্থন দিয়ে অবৈধ জুয়ার আসর “হাউজি” এর টাকা থেকে একটা ভাগ পেত। সেই টাকায় সাংবাদিক নেতা কয়েকজন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বাড়ীও করেছেন কেউ কেউ। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে শিল্পপতিসহ অন্যান্য টাকা ওয়ালা লোকজনকে ধরে এনে মোটা টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিতেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে আগে ও পরে বহু বিএনপি নেতাকর্মীতে মিথ্যা গাড়ী পোড়ানোসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার-নির্যাতন-হয়রানী করেছেন। তিনি স্থানীয় একটি পত্রিকার সম্পাদককেও মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করেছেন। একাজেও কয়েকজন সাংবাদিক জড়িত ছিলো বলে গুঞ্জন রয়েছে। এমন বহু অপকর্মের সহযোগী ছিলেন গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। এসপি হারুনের অনুগত সাংবাদিকদের অধিকাংশ সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরেরও অনুগত হিসাবে জনশ্রুতি আছে।
এরপর ২০১৮ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর শুরু হয় এসপি হারুনের নারায়ণগঞ্জ অধ্যায়। ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন এই হারুন। অপহরণ, গুম, চাঁদাবাজির মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন জেলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সে সময় শামীম ওসমানের সঙ্গে দ্বন্দ্বসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে আলোচিত হন এই পুলিশ কর্মকর্তা। চাঁদার জন্য তিনি একাধিক শিল্পপতিকে তুলে নিয়ে সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয় দেখাতেন। এর ধারাবাহিকতায় চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী-সন্তানকে রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে এসপি হারুন একদল পুলিশ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে তুলে নিয়ে যান। পরে তারা মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে ২০১৯ সালের ১০ই নভেম্বর এসপি হারুনকে নারায়ণগঞ্জ থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে (ট্রেনিং রিজার্ভ) সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের আশীর্বাদে এসপি হারুনকে ২০২০ সালের ৯ই জুন ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে তেজগাঁও বিভাগের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ২রা মে তাকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দিয়ে ১১ই মে ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার করা হয়। এরপর ২০২২ সালের ১২ই জুন হারুনকে ডিএমপি’র ডিবি প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ডিবি প্রধান হিসেবে বিএনপি’র নয়াপল্টন অফিসে নানা নাটক মঞ্চস্থ করে বিএনপি নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নে নেতৃত্ব দেন হারুন। হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতা তার দ্বারা নিগ্রহের শিকার হন। ডিবি অফিসে নিয়ে মধ্যাহ্নভোজ এবং সেসবের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে তিনি ডিবি প্রধানের কার্যালয়কে পরিচিত করান ‘ভাতের হোটেল’ হিসেবে। সর্বশেষ কোটা আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে নিরাপত্তা হেফাজতের নামে আটকে রেখে ভিডিও স্টেটমেন্ট নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচিত ও সমালোচিত হন। এরপর গত ৩১শে জুলাই তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এর দায়িত্ব দেয়া হয়।
ডিএমপি’র সাবেক ডিবি প্রধান হারুন তার গ্রামের বাড়িতে শত কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তুলেছেন প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট নামে অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল একটি প্রমোদাগার। মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে ৪০ একরেরও বেশি জায়গা নিয়ে রিসোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। রিসোর্টটির প্রিমিয়াম স্যুটের প্রতিদিনের ভাড়া ২০ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন ডিলাক্স রুমের ভাড়া প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া সুপার ডিলাক্স রুমের ভাড়া ১২ হাজার টাকা। ২০২১ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর রিসোর্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। রিসোর্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং রিসোর্ট উদ্বোধন উভয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের ছেলে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক।
প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার ছোট ভাই ডা. শাহরিয়ার। রিসোর্টটিতে হারুনের পরিবারের ৫ থেকে ৭ একর জায়গা রয়েছে। বাকি অন্তত ৩৫ একর জায়গা ছিল অন্যদের। এসব জায়গার মালিকদের দাম দেয়ার কথা বলে হারুন রিসোর্টের জন্য জায়গা দখলে নেন। জায়গার মালিকদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজন রয়েছেন। এসব জায়গার জন্য কেউই পুরো দাম পাননি।
গোয়েন্দা পুলিশের ওই কর্মকর্তা মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে ভাত খাইয়ে ভিডিও ছেড়ে দেওয়া, বিরোধী দলের প্রতিটি আন্দোলনে বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে ‘বোমা ও বাঁশের লাঠিসোটা’ উদ্ধার, প্রতিদিনই সাংবাদিকদের একাধিকবার ব্রিফিং করা, তারকাদের সঙ্গে ফটোসেশন, যাকে তাকে ডিবিতে তুলে নিয়ে আসা, হেফাজতে নির্যাতন, আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়–এমন নানান নেতিবাচক কাজে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত এই কর্মকর্তা।
Leave a Reply