মাওলানা সাদ’র ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দ এর ফতোয়া পরিবর্তন
মৃণাল চৌধুরী সৈকত
টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে আম বয়ানের মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ ৫৭তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্যদিয়ে ইজতেমার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রথম পর্বের চেয়ে দ্বিতীয় পর্বে শুরু হওয়া বিশ্ব ইজতেমায় সার্বিক মুসল্লিদের সমাগম কিছুটা কম দেখা গেলেও চলমান দ্বিতীয় পর্বে মুরব্বীদের সমাগম বেশী বলে অনেকেই ধারণা করেছেন অনেকে।
ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে দিল্লির মাওলানা সাদ অনুসারী তাবলীগ মুসল্লিরা অংশ নিয়েছেন। সারাদেশ থেকে মুসল্লিরা এসে অবস্থান নিয়েছেন ইজতেমা ময়দানের নির্ধারিত খিত্তায়। মুসল্লিরা দাবি করেছেন তারা এই বিভক্ত তাবলীগ জামাত চান না, সবাই একত্র এক জামাতের ইজতেমা পালন করতে চান। যাতে করে ইসলামের কর্মের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তালাকে রাজি খুশি করে পরকালে শান্তি পেতে পারেন।
গত পর্বে মুসল্লীদের সাথে সাথে বধির মুসল্লীদের (বোবা/কানে শুনে না) আরো ৭টা জামাত যুক্ত হয়। এতে করে মোট ২৭৫৭ জামাত, দেশ-বিদেশে আল্লাহর নামে ইসলামের দাওয়াতের কাজে বের হয়।
এবং গত পর্বে ইজতেমায় আগত মুসল্লীদের মধ্যে বা তাবলীগের সাথী ১৪ জন এবং বহিরাগত ৬ জন মৃত্যু বরণ করেন।
এছাড়া ৭২ দেশ থেকে প্রায় ৮ হাজার বিদেশী মেহমান অংশগ্রহণ করেন। এবং সরকারি হিসেবে যে সংখ্যাটি পাওয়া গেছেন সেটা শুধু তাবলীগ ভিসায় যারা এসেছে সেটি। টুরিস্ট ভিসা কাউন্ট করা হয়নি। অথচ টুরিস্ট ভিসায় ইজতেমায় আগত মুসল্লী আরো বেশি আসে)
এদিকে, মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দ এর ফতোয়া পরিবর্তন হয়েছে বলে সাদ পন্থীরা বিভিন্ন জায়গায় দাবি করছেন বলে যোবায়েরপহ্নীরা দাবী করছেন। এ ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের মোহতামীম (প্রিন্সিপাল) এর এক অডিও ও ভিডিও বার্তা যোবায়ের পহ্নীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে তারা যোগাযোগ করেন বলে জানান। সেখানে দারুল উলুম দেওবন্দ মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যাপারে তাদের ফতোয়া এবং অবস্থান পরিস্কার করেছেন মুফতি আবুল কাশেম নোমনী।
যোবায়েরপহ্নীদেও সূত্রানূয়ায়ী : গত ৭ ফেব্রুয়ারী দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম (প্রিন্সপাল) মুফতি আবুল কাসেম নোমানী জানান- মাওলানা সাদের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া ও অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যাপারে দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ায় পরিবর্তন এসেছে, এই অপপ্রচার শুনে আমি ভীষণ অবাক হয়েছি। কারণ, ফতোয়া প্রকাশিত হওয়ার পর মাওলানা সাদ সাহেব দারুল উলুম দেওবন্দে আসেননি। আমাদের কারো সাথে তার কোনো সাক্ষাতও ঘটেনি। তিনি ব্যক্তিগত সফরে মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানি সাহেবের সাথে সাক্ষাত করেছেন। তাঁর সাথে তার সৌজন্যতামূলক নিমন্ত্রণ হয়েছে। তাদের মাঝে কি কথপোকথন হয়েছে, তা আমরা শুনিনি।
আমি আবারও বলছি, তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে আসেননি এবং কোনো মাসআলায় আমাদের সামনে তিনি রুজু করেননি। তিনি বিগত কয়েক বছর যাবত যেসব গুমরাহ বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন, তার কোনোটা থেকে তিনি রুজুর (ভুল স্বীকার) ঘোষণা দেননি।
আমি আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে বলছি, তিনি এখনো অবিকল পূর্বের মতো গুমরাহ বয়ান করে থাকেন। এ বছর (২০২৪ ই.) জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে তার বয়ান সংকলন ইরশাদাতে আকাবির নামে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি এখন আমার সামনে রয়েছে। এ বইয়ের মাঝে অবিকল তার সেসব গুমরাহিপূর্ণ আপত্তিকর বয়ান রয়েছে, যা তিনি নিয়মিত বলে থাকেন।
অতএব, তার রুজুর ব্যাপারে মাওলানা আরশাদ মাদানি দা.বা. কোনো কথা বলে থাকলে এটা একান্তই তাঁর নিজস্ব অভিমত। এর সাথে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের কোনোরূপ সম্পর্ক নেই। মাওলানা সাদ সাহেবের ব্যাপারে দারুল উলূম দেওবন্দের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং এ জাতীয় কোনো ঘোষণা আমরা দিইনি। আস-সালামু আলাইকুম ওয়া-রহমাতুল্লাহ।
টঙ্গী পশ্চিম থানার অফিসার্স ইনচার্জ ভারপ্রাপ্ত (ওসি) বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবারেও মুসল্লিদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশসহ আনসার সমন্বয়ে গঠিত কয়েক সেক্টরের নিরাপত্তা বলয় গড়তে তুলেছে। দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমার জন্য প্রথম পর্বের অবকাঠামো স্বাভাবিক রয়েছে। মুসল্লিদের সুযোগ সুবিধা পানি বিদ্যুৎ গ্যাসসহ সব ব্যবস্থায় স্বাভাবিক রয়েছে।
ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মিডিয়া সমন্বয়ক বলেন, সকালে আম বয়ানের মধ্যেদিয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু । বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাবলীগের মুসল্লিরা যোগদান করেছেন। বিদেশি মেহমানদের আবাসনসহ সব বিষয়ে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবারেও মুসল্লিদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশসহ আনসার সমন্বয়ে গঠিত কয়েক সেক্টরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমার জন্য প্রথম পর্বের অবকাঠামো স্বাভাবিক রয়েছে। মুসল্লিদের সুযোগ সুবিধা পানি বিদ্যুৎ গ্যাসসহ সব ব্যবস্থায় স্বাভাবিক রয়েছে।
মেট্রোরেলেসহ যানবাহনে ইজতেমাগামী মুসল্লিদের ভিড় :
ইজতেমা ময়দানে জুমার নামাজে অংশ নিতে মেট্রোরেলে চড়ে যেতে দেখা গেছে বহু মুসল্লিকে। তাদের অনেকে প্রথমবারের মতো মেট্রোরেলে চড়তে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তবে এ যাত্রায় তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে উত্তরা অংশে।
উত্তরা এলাকায় ট্রেন থেকে নেমে মুসল্লিরা নির্ধারিত বাস না পেয়ে রিকশা, সিএনজি, অটোতে ছুটছেন ইজতেমা ময়দানে। নির্ধারিত বিআরটিসি বাসে থাকলেও দীর্ঘ সময় পর পর আসতে দেখা গেছে।
অনেককে দীর্ঘ সময় উত্তরা স্টেশনের নিচে অবস্থান করে দেখা যায়। নির্ধারিত বিআরটিসি বাসে চড়ে মুসল্লিরা ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন। এজন্য ভাড়া দিতে হচ্ছে দ্বিগুন। যদিও একটির পর একটি বাস আসতে সময় লেগে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
লেগুনায় চড়ে ইজতেমা ময়দানে যেতে দিতে হচ্ছে, ৪০/৫০ টাকা। এছাড়াও অটোতে যেতে দিতে হচ্ছে ১০০/১৫০ টাকা করে। কেউ কেউ দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে যাচ্ছেন সিএনজি, বাইকযোগে।
পরিবহন শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইজতেমা অভিমুখে যাওয়ার পর ফিরে আসা কষ্টকর হয়ে পড়ে। গড়ি দীর্ঘসময় জ্যামে পড়ে থাকতে হচ্ছে। যে কারণে গাড়ি আসতে সময় লাগছে এবং ভাড়াও কিছু বেশী নেয়া হচ্ছে।
এর আগে প্রথম পর্বের ইজতেমার শেষে মাওলানা জুবায়ের অনুসারীরা ইজতেমা ময়দান গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কাছে বুঝিয়ে দেন এবং জেলা প্রশাসক মাওলানা সাদ অনুসারীদেরকে ইজতেমা ময়দানে অবস্থান নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ময়দান বুঝিয়ে দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, রোববার আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। আম বয়ানের মধ্যদিয়ে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়েছে আজ শুক্রবার বাদ ফজর।
মাসলেহাল জামাত কামরা : ইজতেমা ময়দানে আগত মুসলি¬দের নতুন যে কোন সমস্যা সমাধানকল্পে ময়দানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আশরাফ সেতুর পেছনে মাসলেহাল জামাতের কামরা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বসে ওই জামাতের মুরুব্বিরা উদ্বুত সমস্যার সমাধান দিবেন বলে জানিয়েছেন।
হকার ও ভিক্ষুক উপদ্রব : বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলা ও থানা থেকে টাকা রোজগারের উদ্দেশ্যে ফুটপাতে হকার ও ভিক্ষুক এবং ঘামখোর ইজতেমা ময়দানে ও আশপাশের এলাকায় ভীড় জমিয়েছে। এদের সাথে যোগ হয়েছে পকেটমার, ছিনতাইকারী ও অজ্ঞানপাটির সদস্যরাও, এদের নিয়ন্ত্রণে আইনশৃংখলা বাহিনী কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
Leave a Reply