বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

দেশে চলছে জমজমাট অনলাইন জুয়া সর্বশান্ত হচ্ছে গাজীপুরসহ দেশের সাধারণ মানুষ

মৃণাল চৌধুরী সৈকত
  • আপলোডের সময় : শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৩
  • ৭৮ বার

মোবাইল ফোন হচ্ছে আমাদের নৃত্য দিনের সঙ্গী তথা বিনোদনে প্রধান মাধ্যম। শুধুই কি ফোনালাপ কিংবা ক্ষুদে বার্তা পাঠানো ? না, মোবাইল এখন ব্যাংকিং টুলস, বিল পরিশোধ, জমির খাজনা, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট প্রদান থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের বাহন এই মোবাইল ফোন। সেই মোবাইল ফোনেই খেলা যাচ্ছে জুয়া বা ক্যাসিনো। সর্বনাশের শেষ পর্বটিও এখন মানুষের আঙ্গুলের নাগালে। বেটিং অ্যাপে জুয়ার ফাদ যে শুধু শহর কেন্দ্রিক তা নয়। শহর ছাড়িয়ে তা এখন দেশের আনাচেÑকানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। অতি লোভে পড়ে জুয়ার ফাদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে শহর তথা গ্রামাঞ্চলের সাধারন মানুষ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এক ধরনের কৌতুহল থেকে তরুন প্রজন্ম আকৃষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী জুয়ার সাইটে। পাচশ বা হাজার টাকা বিনিয়োগ দিয়ে শুরু করে লোভে পড়ে এক পর্যায়ে হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। জুয়ার এসব সাইটের অধিকাংশই পরিচালনা করা হচ্ছে বিদেশ থেকে। ফেসবুকÑইউটিউবে প্রচার করা হচ্ছে এসব সাইটের তথ্য। অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে উড়ছে কোটি কোটি টাকা। এই টাকার একটি বড় অংশ পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। জুয়াড়ি চক্রের সদস্যরা মাঝে মধ্যে আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও বেশির ভাগই থেকে যাচ্ছে ধরাছোয়ার বাইরে। জুয়ায় আর্থিক লেনদেনের সহজ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশী মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস [এমএফএস]। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, জুয়ার একাধিক সাইটে বাংলাদেশীদের লেনদেনের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায় যুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ব্যাংকের মাধ্যমেও পেমেন্ট করার সুযোগ। ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করা যায় অর্থ এসব সাইটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হিসাব বা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে দুই কোটি ৯১ লাখ ৯৫ হাজার ৮৬৬ টি । চলতি বছরের আগস্ট শেষে মোট মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২১ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার ৪৭৬ । এক বছর আগে ২০২২ সালের আগস্টের শেষে যা ছিল ১৮ কোটি ৩২ লাখ ২৪ হাজার ৬১০টি। এই হারে অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারন হিসেবে অনলাইন জুয়ার কথা বলছেন অনেকে। চলতি বছর জুলাইতে বিটিআরসিকে অবিলম্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশন, বিশেষ করে স্পোর্টস চ্যানেলসহ ডিজিটাল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে বাজি ও জুয়ার বিজ্ঞাপন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে হাইকোটের্র নির্দেশ থাকলেও প্রচার প্রচারণা থেমে নেই জুয়ারীদের।
খোজ খবর নিয়ে দেখা যায়, এসব অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হলেও সমম্বয়ের জন্য দেশীয় সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা এজেন্ট হিসেবে কাজ করে তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ফেসবুক গ্রুপ বা পেজ খুলে প্রচার চালানো হচ্ছে। জুয়া খেলা বেশি করে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে স্কুল কলেজ, ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীসহ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে বাংলায়। অনলাইন ক্যাসিনোর অ্যাপ ইনস্টলের জন্যও দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন অফার। এমনকি বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেলিব্রিটির ছবিও দেখা যাচ্ছে। অনলাইন জুয়ার সাইট বেটউইনারের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানে বেটউইনার নিউজের দূত হিসেবে চুিক্ত করে ইতিমধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের সবচেয়ে বড় তারকা সাকিব আল হাসান। সমালোচনা ও বিসিবির শাস্তির হুমকিতে সেই চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন সাকিব। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেননি বাংলাদেশ ক্রিকেটের অধিনায়ক। ফের একটি অনলাইন জুয়ার সাইটের সঙ্গে জড়িয়েছে সাকিবের নাম। বাবু ৮৮নামে একটি অনলাইন ক্যাসিনো ও ক্রিকেট এক্সচেঞ্জ সাইটের বিজ্ঞাপনে সাকিব দাবি করছেন, বাবু ৮৮ সাইটটি বাংলাদেশের এক নম্বর স্পোর্টস প্লাটফর্ম। যেখানে ক্রিকেটসহ বাকি সব খেলার আপডেট পাওয়া যাবে। তবে সাইটটিতে ঢুকলে দেখা যায়, এখানে ক্রিকেট নিয়ে বাজি তো ধরাই যায়. চাইলে খেলা যায় ক্যাসিনো, স্লট গেমের মতো জুয়াও।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে জুয়া নিষিদ্ধ হলেও এসব জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন যেমন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেখা গেছে এবং ইউটিউব চ্যানেল গুলোতেও প্রচার হতেও দেখা যাচ্ছে। এমনই একটি অনলাইন জুয়ার সাইটের বিজ্ঞাপন প্রচার করায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় এক ইউটিউবার এবং তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। গত বছর চব্বিশে ফেব্রুয়ারি তাদের নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপÍার করা হয়। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে নতুন আইন করছে সরকার। এ জন্য নতুন জুয়া আইন, ২০২৩ এর খসড়া করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন-নিরাপত্তা বিভাগ। মূলত : ১৮৬৭ সালের দ্য পাবলিক গ্র্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। কারণ অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ জুয়ার খপ্পরে নি:শ^ হচ্ছেন গাজীপুরসহ দেশের অনেকে।
একটি সূত্রে জানা যায়, গাজীপুর শিল্পাঞ্চল এলাকা হওয়ার কারণে এ এলাকায় দরিদ্র শ্রেনীর শ্রমজীবি মানুষের সংখ্যা বেশী। বিভিন্ন মিল-কলকারখানায় চাকুরীরত শিক্ষিত যুবক এবং মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায় দোকানদারদের টার্গেট করে এসব জুয়ারী প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থানা জুয়ারীরা। বোদ্ধামহল এসব জুয়ার এ্যাপস বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ আইনর্শৃংখলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories