দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে আদালত। দেশটির অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সরকারকে উচ্ছেদে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে চলমান মামলার রায় দেয়া হবে। রাষ্ট্রপক্ষ ইউন সুক ইওলের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে এবং এমনই রায় হবে বলে আশাবাদী প্রসিকিউটররা।
বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনার মূল হোতা ছিলেন ইউন নিজেই। তবে বাস্তবে মৃত্যুদণ্ড রায় হলেও কার্যত তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিণত হবে। কারণ, দক্ষিণ কোরিয়ায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না।
এই রায়কে দেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন সংবাদদাতারা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউন সুক ইওলের স্বল্পস্থায়ী সামরিক আইন ঘোষণার পর থেকে দেশটি নজিরবিহীন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদিও তিনি ইতোমধ্যে অভিশংসিত ও কারাবন্দি, তবুও তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
তবে আজকের মামলাটিই সবচেয়ে গুরুতর। এর কারণ এতে অভিযোগ আনা হয়েছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব উচ্ছেদের বা ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহারের, যা দেশটিতে সর্বোচ্চ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দিয়েছে, এর চেয়ে হালকা সাজা দিলে ভবিষ্যতে কেউ আবার সামরিক শাসন জারির মতো পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ পেতে পারে।
ইউন সুক ইওল আজ সেই একই আদালতে উপস্থিত থাকবেন, যেখানে প্রায় ৩০ বছর আগে সাবেক নেতা চুন দু-হোয়ান-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। ১৯৮০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে তিনি ১৯৮০-এর দশকের বড় একটি সময় স্বৈরশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। যদিও পরে তিনি মাত্র দুই বছর কারাভোগের পর ক্ষমা পান।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালতের বাইরে শত শত ইউনপন্থি সমর্থক জড়ো হয়েছেন। আগের মাসে দেয়া আরেকটি রায়ের সময়ের তুলনায় আজ ভিড় অনেক বেশি। উলসান বন্দরনগরী থেকে পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে সিউলে এসেছেন ৫৫ বছর বয়সী লি কি-জু।
তিনি বলেন, ‘আদালত যেন আমাদের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করে দেয় এই আশা নিয়ে আমি এখানে এসেছি। এই রায়ের ওপর আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ এবং উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর অস্তিত্ব নির্ভর করছে। সামরিক আইন পুরোপুরি যৌক্তিক ছিল। তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।
অন্যদিকে, আদালতের কাছেই আয়োজিত ইউনবিরোধী সমাবেশে অংশ নেয়া পার্ক হান-গ্যু (৫৫) বলেন, ‘আমি চাই ইউন মৃত্যুদণ্ড পাক। তার কোনো অনুশোচনা নেই। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি না যে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। যদি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, তাহলে সেটিই প্রমাণ করবে—এই দেশ আর কখনো আত্ম-অভ্যুত্থান, সামরিক আইন জারি বা এ ধরনের বিদ্রোহ মেনে নেবে না।
সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট-এর বাইরে জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ডজনখানেক পুলিশ বাস দিয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আজকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এলাকাটিতে।
কী করেছিলেন ইউন সুক ইওল?
২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ইউন সুক ইওল সরাসরি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন, যা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এর পরপরই তিনি সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করে জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে ফেলেন, যাতে সংসদ সদস্যরা তার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে না পারেন। এমনকি সংসদের স্পিকার ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর তৎকালীন নেতাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশও দেন।
ইউন দাবি করেছিলেন, উত্তর কোরিয়াপন্থি “রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি” থেকে দেশকে রক্ষা করতেই তিনি সামরিক শাসন জারি করতে চেয়েছিলেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়, এই পদক্ষেপের পেছনে ছিল তার নিজের রাজনৈতিক সংকট। সংসদ সদস্যরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোটের মাধ্যমে সামরিক আইন বাতিল করলে ইউনকে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হতে হয়। এরপর শুরু হয় টানা কয়েক মাসের বিক্ষোভ। এরপর ইউনের বিরুদ্ধে আনা হয় একের পর এক অভিযোগ।
Leave a Reply