দিন গণনা শুরু হয়েছে মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ও স্মৃতিমাখা মাস ফেব্রুয়ারির। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এ মাসজুড়ে। সাত দশক আগের সেই আন্দোলন এবং ভাষা শহিদরা আজও বাঙালির প্রতিটি ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে প্রেরণা জোগায়।
বাংলা ভাষা জীবনের দামে কেনা বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সেদিন ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে আসে।
পেরিয়ে গেছে ৭৪ বছর। তবে বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমোঘ প্রেরণা হয়ে আছে সেই বায়ান্ন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা চব্বিশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলন যুগে যুগে মুক্তিকামী মানুষ উজ্জীবিত হওয়ার প্রেরণা খুঁজে নেয় সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারের আত্মত্যাগ থেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ের সব আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, যার প্রতিফলন আমরা ’২৪-এর আন্দোলনেও দেখতে পাই। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণি ও জনগোষ্ঠী সমানভাবে এ আন্দোলনকে তাদের প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছে।
নির্বাচন, গণতন্ত্র কিংবা অধিকার আদায়ের প্রতিটি নতুন গতিপথ রচনায় ভাষা আন্দোলনের চেতনা আজও রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস। তবে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশের যে অর্জন সম্ভব হয়েছিল, তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে রাজনীতিকরাই এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক বয়ান বিনির্মাণের ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, কী ধরনের স্লোগান দেয়া হচ্ছে, কীভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে, এসব বিষয় রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলে।
তাদের মতে, ভাষা আন্দোলন একটি চলমান ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যা বাংলার মাটিতে বারবার ফিরে আসবে, যতদিন রাষ্ট্রযন্ত্রে বৈষম্য ও অধিকার হরণের পথ খোলা থাকবে।
অধ্যাপক তারিক মনজুর আরও বলেন, ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোতেও যেখানে অপূর্ণতা ও দাবি থাকবে, সেখানে একুশের চেতনা বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৫২-এর আন্দোলন কেবল ভাষার জন্য ছিল না; এর গভীরে নিহিত ছিল আত্মপরিচয় ও স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা যা আজও অনেকাংশে অধরা।
Leave a Reply