সবুজে ঘেরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাস। যে ক্যাম্পাসে প্রতিদিন শত শত তরুণ-তরুণীর পদচারণা, স্বপ্ন আর সম্ভাবনায় ভরপুর মুখগুলো। কিন্তু সেই মুখগুলোর কেউ কেউ এখন শুধুই স্মৃতি। প্রিয় বন্ধুরা আর ফিরে আসবে না ক্লাসে, টিউটোরিয়ামে, কিংবা প্রিয় চায়ের দোকানে। সময়ের নির্মমতায় নিভে গেছে কারো প্রাণ, রেখে গেছে অগণিত প্রিয়জনের কান্না।
শুধু শিক্ষার্থীই নয়, এই বছর বিদায়ের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও। কেউ হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী, কেউ প্রিয় শিক্ষক বা প্রশাসনিক সহযোদ্ধা। অফিসকক্ষে, কিংবা বিকেলের নির্জন ক্যাম্পাসে–তাদের অনুপস্থিতি আজও অনুভব করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।
আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ। গত ১৭ জুলাই বিকেলে শাহ আজিজুর রহমান হলের পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ। ৩ আগস্ট ভিসেরা রিপোর্টে জানা যায়, তার মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরোধে। ৪ আগস্ট তার বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ হত্যা মামলা দায়ের করেন, যা দুই মাস পর তদন্তের জন্য সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই অকাল মৃত্যু বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আন্দোলিত করে অসংখ্য হৃদয়। মৃত্যুর সাড়ে পাঁচ মাস হলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে তার খুনিরা। বিচারের অপেক্ষায় সাজিদের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, সহপাঠীসহ হাজারো ইবিয়ান।
বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদা মাহজাবিন মৌ ও তার স্বামী হৃদয় হোসেন। ৫ এপ্রিল পদ্মা নদীতে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান নবদম্পতি এই দুই তরুণ–তরুণী। ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া দম্পতি সাতবারিয়া ঘাটে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হন। পরদিন সকালে ডুবুরি দল তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে জানা যায়।
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী সুমাইয়া শারমিন শান্তা দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় ভারতের রেলা হাসপাতালে, যেখানে ৬ মে তার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়। কিন্তু অপারেশনের পর আর জ্ঞান ফেরেনি তার। ২১ জুন রাত ১টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শান্তা। ইবির তালিকায় যুক্ত হয় আরো একটি দীর্ঘশ্বাসের।
জয়পুরহাটের পাঁচবিবির সন্তান রাশেদুল ইসলাম। সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করে নতুন স্বপ্নে ভাসছিলেন আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী। ১৬ জুন সকালে কুষ্টিয়া থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে বিত্তিপাড়া এলাকায় বাস–ট্রাক সংঘর্ষ ঘটে। প্রাণ হারান তিনি। হারিয়ে যায় তার স্বপ্ন।
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উত্তম কুমার রায় দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে (CKD) ভুগছিলেন। বন্ধু–সহপাঠীরা তার চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় নির্মম বাস্তবতার কাছে। ১৬ জুলাই সকালে উত্তম চলে যায় না ফেরার দেশে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো বিভাগে নেমে আসে শোকের ছায়া।
আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবুল কাশেম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৯ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিশ ইবি শাখার সদস্য। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও এক বছরের সন্তান রেখে গেছেন।
পূজার ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলেন সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দেবতোষ সরকার দিব্য। হঠাৎ করেই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আহত হয়ে ভর্তি হতে হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে ৩০ অক্টোবর সকালে তার মৃত্যু হয়। ইবি হারিয়ে ফেলে আরেক সম্ভাবনাময় তরুণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে।
এছাড়াও, বার্ধক্যজনিত কারণে গত ৪ নভেম্বর মারা যান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. ইয়াহিয়া রহমান।। বার্ধক্যজনিত কারণে দীর্ঘদীন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন তিনি। এ অসুস্থতার কারণেই নিজ বাসা গাজীপুরে মৃত্যু হয় তার।
১৩ জুন বিকেলে ঢাকার এভার কেয়ার হসপিটালে ব্রেইন স্ট্রোক করে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার ও কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি মো: দেওয়ান টিপু সলতান। কুষ্টিয়ায় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের ধাক্কায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার মোছা. ইশরাত জাহান লাবনী আহত হন। পরে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এই মুখগুলো আর দেখা যাবে না ক্লাসরুমে, টিউটোরিয়ালে কিংবা বিকেলের চায়ের আড্ডায়। কেউবা আবার সময় মতো বসবেন না প্রশাসন ভবনে। তবু তাদের হাসি, স্বপ্ন আর প্রাণশক্তি আজও বেঁচে আছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রান্তে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে তারা হয়ে থাকবেন নীরব স্মৃতি, কিন্তু অমলিন।
Leave a Reply