শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট কার্যালয়ে ঢুকে পরিচালককে পেটাল দুর্বৃত্তরা মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পে ১ বিলিয়ন ডলারের কাজ পেল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু ৩১ অক্টোবর কুমিল্লায় হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ফাটা বাঁশের চিপায় পড়েছেন গোলাম পরওয়ার : রাশেদ খান প্রকাশ্যে ভারতে বিরোধীতা করলেও তলে তলে আঁতাত করছে জামায়াত: আবু হানিফ বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট করতেই দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল আওয়ামী লীগ: রিজভী রাজধানী ঢাকার গুলিস্তানে উচ্ছেদ অভিযান চালাল ডিএসসিসি নভেম্বরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ : সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন রংপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কায় ৩ জনের মৃত্যু

একই চত্বরে দুই প্রজন্ম, এক আকাশে মিলল হাসির দুটি রং

অনলাইন ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৪ বার
একই চত্বরে দুই প্রজন্ম, এক আকাশে মিলল হাসির দুটি রং

সবার মুখে টানটান উত্তেজনা, ঘড়ির কাঁটা যেন গুনছে প্রতিটি সেকেন্ড। মঞ্চে শুরু হলো জ্ঞানের লড়াই, ক্লু দেয়া হবে একে একে তিনটি, আর প্রতিটি ক্লুর পর উত্তর দিতে হবে মাত্র দশ সেকেন্ডের মধ্যে। এই স্বল্প সময়েই শুরু হলো চিন্তা, বিশ্লেষণ আর দলীয় সমন্বয়ের কঠিন পরীক্ষা। প্রথম দল যদি উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, সুযোগ সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় দ্বিতীয় দলের হাতে।
দর্শকদের নিঃশ্বাসও যেন থেমে যায় সেই মুহূর্তে, কে আগে বলবে সঠিক উত্তর? চলছে গেসিং গেম, নিঃশব্দ এক স্নায়ুযুদ্ধ। চোখের ইশারায় কেউ কেউ বার্তা পাঠাচ্ছে, কেউ মনোযোগ দিচ্ছে কুইজমাস্টারের ঠোঁটের নাড়াচাড়ায়। জয়ের আকাঙ্ক্ষায় মুখর প্রতিটি মুখ, উত্তেজনায় কাঁপছে বাতাস। শেষে কে জিতবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট
তবে আশ্চর্যের বিষয়, দুই দলের সদস্যরাই আবার একই প্র্যাকটিক্যাল গ্রুপের ক্লাসমেট, কিন্তু খেলায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী। এই মিষ্টি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেন জেগে উঠল এক নতুন সখ্যতা। এমনই এক উচ্ছ্বসিত দৃশ্য ধরা দিয়েছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) বৈশাখী চত্বরে। গত ১৭ অক্টোবর কৃষি অনুষদের সেকশন সি গ্রুপ নাইনের দুই প্রজন্ম ৬২ ও ৬৩ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, সম্প্রীতির আয়োজন শুরু হয় বেলা ১১টার দিকে। তার আগেই বৈশাখী চত্বরে জড়ো হয় ৬২ ব্যাচের সিনিয়র ভাই-বোনেরা। অপেক্ষা তাদের প্রিয় জুনিয়রদের জন্য। নির্ধারিত সময়েই পৌঁছে যায় ৬৩ ব্যাচের জুনিয়ররা। হাসি মুখে, উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে শুরু হলো অভ্যর্থনা। সালাম আর শুভেচ্ছায় মেতে উঠল দু’দল প্রজন্ম। চোখেমুখে দেখা গেল এক অনির্বচনীয় আনন্দ, যেন বহু বছরের পরিচিত এক পরিবারের পুনর্মিলন নতুন করে রঙিন হলো।
মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় পরিচয়পর্বের মাধ্যমে। জুনিয়ররা একে একে নিজেদের নাম ও হোমটাউন বলছে, দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত এসব মুখ চিনে নিচ্ছেন অগ্রজরা। কেউ খোঁজ নিচ্ছেন, তোমার বাসা তো আমার পাশেই! আবার কেউ ক্যাম্পাস জীবনের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা শোনালেন আপন ভঙ্গিতে। কেউ শেয়ার করছেন ক্যাম্পাস জীবনের অভিজ্ঞতা, দিকনির্দেশনা ও একাডেমিক ভালো করার উপদেশ। অনুজরাও মনোযোগ দিয়ে শুনছে প্রতিটি কথা। গাছের ছায়া, খোলা আকাশ, আর ব্রহ্মপুত্র নদের নির্মল হাওয়া- সব মিলিয়ে যেন এক পরিবারে রূপ নিয়েছে বৈশাখী চত্বর। হাসি, গল্প, আলিঙ্গন আর ছবির ফ্ল্যাশে একাকার হয়ে যায় প্রাঙ্গণ।
গত বছর ৬১ ব্যাচের সিনিয়র ভাই-বোনরা ঠিক একইভাবে বরণ করে নিয়েছিল তাদের জুনিয়রদের। স্মৃতির পাতায় ডুব দিলে তাদের সঙ্গে কাটানো গোধূলি বেলার আড্ডায় মাতানো দিনটি চোখে ভেসে উঠে। ক্যাম্পাসের এই ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহমান থাকুক।
এরপর শুরু হয় কেক কাটার পালা। সিনিয়র ভাই-বোনেরা জুনিয়রদের মুখে কেক তুলে দেন, মিষ্টিমুখের সেই মুহূর্তে পুরো প্রাঙ্গণ ভরে উঠে করতালি আর হাসিতে। এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত, এক সুন্দর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। ছবি তোলার ব্যস্ততায় কেউ পোজ দিলো, কেউ হাসল নির্ভেজাল আনন্দে। চললো মজার মজার ডাকাডাকি।
এবার শুরু সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ। গেমিং পর্ব- বল পাসিং, টার্গেট অন গোল, গেস দ্য নেম, প্রতিটি খেলায় টানটান উত্তেজনা। প্রথমে বল পাসিং গেম- ৬৩ ব্যাচের জুনিয়রদের সঙ্গে অংশ নেন ৬২ ব্যাচের চারজন। বাঁশি বাজতেই উত্তেজনার শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। একে একে সবাই আউট হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে ওঠে হাসির রোল চত্বর, আর চারপাশে তুমুল উৎসাহ। শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হাসি আর করতালিতে ভাসেন জুনিয়র ব্যাচের নিশাত, আশা ও কণিতা।
বোতলকে গোলপোস্ট বানিয়ে তারপর শুরু হলো ‘ টার্গেট অন গোল’, এক উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিযোগিতা। যে এর ফাঁক গলিয়ে বল পাঠাতে পারবে, সে-ই জয়ী। কেউ গোল দিতেই করতালির ঝড় ওঠে, কেউ আবার ব্যর্থ হলে হাসির হুল্লোড়। এভাবে চললো কয়েক রাউন্ড, শেষে ফাইনাল রাউন্ডে সবচেয়ে কঠিন টার্গেট, একটি বোতল। শেষ ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন ব্যর্থ, বিজয়ের হাসি তখন ৬২ ব্যাচের সিনিয়র মাশরুলের মুখে! সেই মুহূর্তে করতালির গর্জনে দুলে ওঠে চারদিক।
গেমের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর পর্ব ‘গেস দ্য নেম’ শুরু হতেই যেন পুরো পরিবেশ জমে উঠল উত্তেজনায়। লেখার শুরুতে বর্ণিত সেই প্রাণচঞ্চল মুহূর্তে ফিরে এলো আবারও, আগের চেয়ে আরও বেশি উচ্ছ্বাস আর উন্মাদনা। পাঁচ টাকার কয়েনের দুই পাশকে ঘিরেই নাম রাখা হয়েছিল দুই দলের। প্রশ্নোত্তরের ধারাবাহিকতায় একে অপরকে টপকে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। অবশেষে রোমাঞ্চকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে বিজয়ের মুকুট উঠে ‘মুজিবের উল্টা পাশ’ দলের মাথায়।
ক্লাস, পরীক্ষা আর প্র্যাকটিক্যালের ক্লান্তি ভুলে দুই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ডুবে গিয়েছিল হাসি, আড্ডা আর রোমাঞ্চে ভরা এক মিলনমেলায়। একদিনের এই আয়োজন যেন স্মৃতির অ্যালবামে জায়গা করে নিলো, হয়ে থাকবে আগামীর পথচলার প্রেরণা।
অনুভূতি প্রকাশে ৬৩ ব্যাচের মোহাম্মদ সাইফুল হাবিব বলেন, আসলে এবারের মিটআপ প্রোগ্রাম ছিল ভিন্ন মোড়কে, বৈচিত্র্য আর আনন্দে ভরপুর। সিনিয়র ভাই-আপুরা আমাদের ক্লাব, গবেষণা ও একাডেমিক বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। সিনিয়র ভাই-বোনদের আন্তরিকতা আর গাইডলাইন আমাদের সত্যিই অনুপ্রাণিত করেছে। এই মিটআপ না হলে হয়তো আমাদের জড়তাগুলো কাটতো না, হাসি-ঠাট্টার এই মুহূর্তগুলো কখনোই আসতো না। আশা করি, এই আয়োজনের ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও থাকবে।
অন্য এক ৬৩ ব্যাচের জুনিয়র তাহসিনা ইসলাম বলেন, প্রথম বর্ষের ২য় সেমিস্টারের পড়ার চাপের মাঝে সিনিয়র ভাই-বোনরা আমাদের জন্য এনে দিলেন এমন একটি প্রাণবন্ত দিন। পরিচয়, কেক, খেলা, উপহার সবই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সবার মাঝে হাসির ঝরনায় ভরিয়ে তুলেছেন দিনটিকে। এ রকম মিটআপ আমাদের বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করবে, এই দিনটার স্মৃতি চিরকাল থেকে যাবে।
৬২ ব্যাচের গ্রুপ প্রতিনিধি শাওন বলেন, জুনিয়রদের সঙ্গে আমাদের মিটআপটা সত্যিই দারুণ ছিল। আমার সহপাঠী ও জুনিয়ররা সবাই খুব আন্তরিক, উচ্ছ্বসিত ছিল। সবার সহযোগিতায় এত বড় আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শুরুতে অল্প কিছু ভুল ত্রুটিও হয়েছে, তবে সবার একান্ত প্রচেষ্টায় প্রাণবন্ত আয়োজনে শেষ হয়েছে।
বিকেলের আলো যখন নরম হয়ে আসে, তবুও হাসির ধ্বনি মিলিয়ে যায় না। সবাই জানে, এই দিন শুধু এক দিনের নয়, এক অমলিন স্মৃতি, যেখানে প্রজন্ম মিশে যায় ভালোবাসার আকাশে। তাই কবি আল মাহমুদের ভাষায় বলতে হয়, ‘যে সম্পর্ক সময়কে হার মানায়, সেটাই আসল সম্প্রীতির নাম।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories