রমজান মাস প্রায় শেষ মুহূর্তে। এ মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাহরি ও ইফতারে রকমারি খাবার রাখা হয়। দিনভর পানাহার থেকে মুক্ত থাকা হলেও ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত নানা ধরনের খাবার খাওয়া হয়। এ সময় স্বাস্থ্য ও পুষ্টিগত বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে সাধারণত মুখরোচক খাবারকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি আমরা।
রমজান মাসে আসরের নামাজের পর থেকে গ্রাম, কিংবা শহরের অলিগলির ব্যস্ত সব জায়গায় ইফতারের পসরা বসে। এতে বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, বুরিন্দা, জিলাপি, হালিম ও মাংসের বিভিন্ন ধরনের পদ থাকে। সেসবই রাখা হয় খাবার টেবিলে। আর সংযমের সময় এসব অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে পরে ভুগতে হয়। এসআইবিএল ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডায়েটিশিয়ান নাঈমা রুবী বলেন―
রোজার সময় শরীরে এক ধরনের মেটাবলিক অ্যাডাপশন ঘটে। দীর্ঘ সময় না খেলে শরীর প্রথমে লিভারে জমা গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে, পরে ধীরে ধীরে চর্বি ভাঙতে শুরু করে। ইনসুলিনের মাত্রা কমে এবং ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়তে পারে। সঠিকভাবে রোজা পালন করলে এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক মেটাবলিক রিসেট হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণ ও রক্তে শর্করা ভারসাম্যে সহায়ক।
এ পুষ্টিবিদ আলাপকালে ইফতারে ভাজাপোড়া ও সাদা চিনির ব্যবহারের ফলে ক্ষতিকরের দিক নিয়েও আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের ইফতার সংস্কৃতিতে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট যেমন- সাদা ময়দা ও চিনি বেশি থাকে। এসব খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি হওয়ায় রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যায়, যাকে গ্লাইসেমিক স্পাইক বলা হয়। এর ফলে হঠাৎ বেশি ইনসুলিন রেসপন্স হয়। ফলে পরে দ্রুত শর্করা নেমে গিয়ে দুর্বলতা ও পুনরায় ক্ষুধা তৈরি হয়।
নাঈমা রুবী বলেন, অতিরিক্ত তেল ও মশলা ডাইজেস্টিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে। অনেকেই অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রিক, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তিতে ভোগেন। সারাদিন পানি না খাওয়ার পর যদি পর্যাপ্ত হাইড্রেশন না হয় এবং ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালেন্স ঠিক না থাকে, তাহলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও নিম্ন রক্তচাপ দেখা দিতে পারে।
এদিকে স্বাভাবিকভাবে রমজান মাসে ঘুমের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন―
রমজানে ঘুমের সময়ও বদলে যায়। সাহরির জন্য ভোরে ওঠা এবং রাতে দেরি করে ঘুমানো আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম, অর্থাৎ শরীরের জৈবঘড়িকে প্রভাবিত করে। সাহরি বাদ দিলে বা ইফতার অতিরিক্ত ভারী হলে দিনের শক্তির মাত্রা অস্থির থাকে এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়।
রোজা কোনো সমস্যা নয়, বরং সঠিকভাবে করলে এটি শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। ইফতার হতে পারে নিউট্রিয়েন্ট ডেনসিটি সমৃদ্ধ, অর্থাৎ কম ক্যালোরিতে বেশি পুষ্টি। খেজুর, ফল, ডাল, ছোলা, দই, সবজি ও পরিমিত প্রোটিন ধীরে শক্তি দেয় এবং রক্তে শর্করা স্থিতিশীল রাখে বলেও জানালেন এ পুষ্টিবিদ।
রমজান শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে এটি শরীরের জন্য একটি উপকারী মেটাবলিক রিসেট হতে পারে। রোজায় সুস্থতার জন্য কয়েকটি বাস্তব পরামর্শ-
১. ইফতার শুরু করুন পানি এবং ১ থেকে ২টি খেজুর দিয়ে। তারপর হালকা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।
২. ভাজাপোড়া কমিয়ে ছোলা, ডাল, ফল ও সবজির পরিমাণ বাড়াতে হবে।
৩. অতিরিক্ত মিষ্টি ও উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স খাবার সীমিত করুন।
৪. ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি ভাগ করে পান করুন।
৫. সাহরিতে জটিল কার্বোহাইড্রেট যেমন- লাল চাল বা ওটস, সঙ্গে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখুন।
৬. প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।
Leave a Reply