বর্তমানে আলঝেইমার রোগের চিকিৎসায় উচ্চমাত্রার মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি বারবার ইনফিউশনের মাধ্যমে দিতে হয়। এর ফলে রোগীর বোধশক্তির অবনতি কমে যায়। তবে গবেষকরা এখন একটি সম্ভাব্য যুগান্তকারী বিকল্প প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে শুধু একটি ইনজেকশনেই আলঝেইমার প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিএআর-অ্যাস্ট্রোসাইট নামের এই প্রযুক্তির মাত্র একটি ইনজেকশনে তরুণ ইঁদুরের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে প্লাক তৈরি হওয়া প্রতিরোধ করেছে। আর বয়স্ক ইঁদুরে থাকা প্লাকের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে।
গবেষকরা অ্যাস্ট্রোসাইট কোষে চিমেরিক অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর (সিএআর) যুক্ত করেছেন, যা কোষকে অ্যামাইলয়েড-বিটা প্রোটিন শনাক্ত এবং তা ধ্বংস করতে সক্ষম করে। মাসে এক বা দুইবার অ্যান্টিবডি ইনফিউশনের পরিবর্তে এই কোষভিত্তিক ইমিউনোথেরাপি ইঁদুরের মডেলে মাত্র একটি ইনজেকশনেই অত্যন্ত কার্যকর ফল দেখিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যখন প্লাক তৈরির আগেই এই চিকিৎসা দেয়া হয়েছে, তখন মস্তিষ্কে প্লাক তৈরি হয়নি। আর যেসব মস্তিষ্কে ইতিমধ্যে প্লাক জমে গিয়েছিল, সেখানে তিন মাসের মধ্যে প্লাকের পরিমাণ ৫০ শতাংশ কমে গেছে।
সাধারণত মস্তিষ্কের প্রতিরক্ষা কোষ মাইক্রোগ্লিয়া বর্জ্য অপসারণের কাজ করে। কিন্তু আলঝেইমার রোগে এরা অতিরিক্ত চাপের কারণে কার্যকারিতা হারায়। সিএআর-অ্যাস্ট্রোসাইট এই ক্লিনিং সিস্টেমকে শক্তিশালী সহায়তা দিতে পারে।
গবেষক দলের মতে, আলঝেইমার ছাড়াও এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের টিউমার শনাক্ত করে ধ্বংস করার জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। সেজন্য সিএআর ডিভাইসকে ক্যানসারের নির্দিষ্ট মার্কার শনাক্তের মতো করে তৈরি করতে হবে।
ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিএআর-টি সেল থেরাপির মতোই এই নতুন পদ্ধতিতে কোষকে একটি সিএআর হোমিং ডিভাইস দেয়া হয়েছে, যাতে তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ধরে ধ্বংস করতে পারে। এই ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু হলো অ্যামাইলয়েড-বিটা প্রোটিন। ফলে পরিবর্তিত অ্যাস্ট্রোসাইট কোষগুলো মস্তিষ্কে জমে থাকা ক্ষতিকর প্রোটিন অপসারণে ‘সুপার ক্লিনার’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক মার্কো কোলোনা বলেন, ‘এটি প্রথম সফল গবেষণা যেখানে অ্যাস্ট্রোসাইটকে এমনভাবে প্রকৌশলগতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে তারা আলঝেইমার আক্রান্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড-বিটা প্লাককে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে অপসারণ করতে পারে। এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মূল্যায়নের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে ফলাফলগুলো নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ এমনকি মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
আলঝেইমার রোগের শুরুটা হয় অ্যামাইলয়েড-বিটা নামের একটি আঠালো প্রোটিন দিয়ে, যা মস্তিষ্কে জমে প্লাক তৈরি করে। এর ফলে একাধিক জৈবিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয় যা শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয় এবং বোধশক্তির অবনতি করে।
মস্তিষ্কে থাকা প্রতিরক্ষা কোষ মাইক্রোগ্লিয়া সাধারণত এই বর্জ্য অপসারণের কাজ করে। কিন্তু নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপের কারণে তারা অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। আর সেই সমস্যা নিরসনেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের নতুন এই আবিষ্কার।
Leave a Reply