বিশ্বের অসংখ্য মানুষ নিদ্রাহীনতা কিংবা ঘুমাতে সমস্যায় ভোগে ভোগেন। এ নিয়ে নানা রকম হিসাব থাকলেও একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের পাঁচ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ অনিদ্রায় ভোগেন। রাতে এপাশ-ওপাশ করে কাটানো অনেকেই ঘুম আনার কৌশল খোঁজেন। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ‘মিলিটারি স্লিপ মেথড’। যে কৌশলে মাত্র দুই মিনিটে যে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারবেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই ট্রেন্ড টিকটকে ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে। টিকটকের সেই ভিডিওগুলো দেখেছে লাখ লাখ মানুষ। ভিডিওগুলোতে যেসব কৌশলের কথা বলা হয়েছে সেগুলো অনুসরণ করলে তাৎক্ষণিক ঘুম আসবে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে তারা বলেন, ‘অবাস্তব’ প্রত্যাশার কারণেই ভাইরাল কৌশলটি আসলে ঘুম আনার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু তারা সেনাদের ঘুমের কিছু কৌশলের কথা বলেন যা তারা ঘুমের মান বাড়াতে প্রয়োগ করে থাকেন এবং অনিদ্রায় ভোগা মানুষেরা চাইলে সেসব কৌশল কাজে লাগাতে পারেন।
মিলিটারি স্লিপ মেথড কী?
ঘুমের এ কৌশলকে একটি ধারণা আকারে হাজির করেন আমেরিকান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড কোচ লয়েড ‘বাড’ উইন্টার। তিনি ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তার বই ‘রিল্যাক্স অ্যান্ড উইন’-এ ঘুমের কৌশলটির সঙ্গে সাধারণ পাঠকদের পরিচিত করান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউএস নেভির প্রিফ্লাইট স্কুলের বিমানচালকরা যাতে চাপের মধ্যেও ভালো ঘুমাতে পারেন এবং নিজ নিজ সেরাটা দিতে পারেন সে জন্য এই কৌশল বের করেছিলেন উইন্টার।
আসলেই কি দুই মিনিটে ঘুম নিয়ে আসতে পারে ‘মিলিটারি স্লিপ মেথড’?
১ .কপাল, মাথার ত্বক, চোয়াল ও মুখ পর্যায়ক্রমে শিথিল করুন, ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন।
২. কাঁধকে নিচে নামান, বড়ো করে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। বুকটা ধীরে ধীরে শিথিল করুন।
৩. যেখানে শুয়েছেন (অর্থাৎ চেয়ার বা বিছানায় ) সেখানে পুরো হাতটি ছেড়ে দিন বা শিথিল করুন। বাইসেপ বা বাহু, কনুইয়ের নিচের অংশ ও হাত- ক্রমান্বয়ে পুরোটাই। এরপর অন্য হাতটাও একইভাবে শিথিল করুন।
৪. পা শিথিল করুন- উরুর অংশ থেকে পর্যায়ক্রমে কাফ বা পায়ের পেছনের নিম্নাংশ, গোড়ালি ও সব শেষে পায়ের পাতা। এরপর অন্য পা একইভাবে শিথিল করুন।
৫. এখন মনে থাকা চিন্তা বের করে দিয়ে আরামদায়ক কিছু কল্পনা করুন। যেমন বসন্তের কোনো দিন বা শান্ত হ্রদের কথা ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
৬. প্রয়োজনে, ‘চিন্তা করো না’ বারবার বলুন এবং কমপক্ষে ১০ সেকেন্ডের জন্য অন্যান্য চিন্তাভাবনা বাদ দিন।
উইন্টার দাবি করেছিলেন, ছয় সপ্তাহের অনুশীলনে বিমানচালকরা যেকোনেও পরিবেশে, দিনের যেকোনও সময় দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমাতে শিখে যাবেন।
হতাশ করতে পারে এই কৌশল
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত দ্রুত ফলাফল পাওয়ার প্রত্যাশা ঘুমানোর প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। মিলিটারি নিউরোসায়েন্টিস্ট ও ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালিসন ব্র্যাগার বলেন, ‘বলা যায় যে এই পদ্ধতিতে আপনি ঘুমাতে পারবেন, তবে দুই মিনিটের মধ্যে আপনি ঘুমোতে পারবেন এমন ভাবা বিপজ্জনক’।
তিনি বলেন, গড়পড়তা মানুষের ঘুম আসতে প্রায় পাঁচ থেকে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তাই মাত্র দুই মিনিটে ঘুম আনার চেষ্টা যে কারোরই বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। এমনকি ঘুমঘুম ভাব কমিয়ে দিতেও পারে। কেউ যদি দুই মিনিটে ঘুমিয়ে যেতে পারেন, এটি হতে পারে দীর্ঘদিন ধরে কম ঘুমিয়ে থাকা কিংবা শনাক্ত হয়নি এমন কোনও সমস্যার কারণে।
ব্র্যাগার আরও বলেন, কিছু সেনাসদস্য সত্যিই এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন বলে তিনি জানেন। কিন্তু সেনাদের ক্লান্তিকর কাজের ধরন বিবেচনায় নিলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের ঘুমিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
সাইকিয়াট্রি ও স্লিপ মেডিসিন কনসালটেন্ট ডা. হিউ সেলসিক বলেন, অনিদ্রায় ভোগা সাধারণ মানুষদের জন্য মিলিটারি স্লিপ মেথড বেশিরভাগ সময় কার্যকর হয় না। সত্যি বলতে, যারা আমার কাছে এসেছেন, তাদের এটি (মিলিটারি স্লিপ মেথড) কাজ করেনি। নয়তো তারা আমার কাছে এসে বসে থাকতেন না।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হসপিটালের ঘুমবিষয়ক ক্লিনিকের প্রধান চিকিৎসক সেলসিক বলেন, ‘আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমের সমস্যায় ভোগেন, তবে ভালো ঘুমকে আদর্শ এবং সঠিক বিষয় বলে মনে করাটা স্বাভাবিক’।
প্রচলিত ধারণা ছিল, আট ঘণ্টা ঘুম আদর্শ। কিন্তু বিষয়টি একজনের ঘুমের চাহিদার চেয়ে আট ঘণ্টাই ঘুমানো প্রয়োজন বলে মনে করিয়ে দেয় এবং অহেতুক একটা চাপ সৃষ্টি করে।
জুতোর সাইজ দিয়ে বিষয়টির তুলনা করেন সেলসিক। গড়পড়তা মানুষ হয়তো সাইজ ছয়, কেউ একেবোরে আট বা চার সাইজের জুতো পরে। কাজেই কারও সাত থেকে আট ঘণ্টার চেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে, কারও কম।
দ্রুত ঘুমানোর তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন তিনি-
১. প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে উঠলে শরীরে একই সময় ঘুমঘুম লাগতে শুরু করে। ফলে প্রতিদিন একই সময়ে ক্লান্ত লাগার এবং ঘুমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
২. দিনের বেলা ন্যাপ বা ছোট ঘুম নেয়া এড়িয়ে চলুন। এতে ঘুমঘুম ভাব কমে যায়, যার ফলে রাতে ঘুমানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. শেষে তিনি বলেন, ঘুমাতে যাওয়া উচিত শুধু তখনই, যখন আপনি ক্লান্ত। যদি শরীর ঘুমের জন্য প্রস্তুত না থাকে তবু ঘুমাতে যান, তাহলে দীর্ঘ সময় শুধু বিছানায় পড়ে থাকতে হবে।
সেনাদের ঘুমানোর কৌশল থেকে আমরা কী শিখতে পারি?
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর স্লিপ সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালেক্স রোক্লিফ বলেন, মিলিটারি স্লিপ মেথড একটু ভুল নামকরণ।
তিনি বলেন, ‘এই কৌশলগুলোর পেছনে যে শারীরবৃত্তীয় (দেহসংক্রান্ত) ও মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে, তার মধ্যে স্বভাবগতভাবে কোনও সামরিক বিষয় নেই’। আসলে এই পদ্ধতিটি পুরোপুরি ভুল নয়—তিনি আরও বলেন, প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন (ধাপে ধাপে পেশি শিথিল করার কৌশল) এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশলগুলো এখনো সেনা সদস্যদের শেখানো হয়। প্রশিক্ষণার্থী সেনা ও সেনা সদস্যদের ঘুমের কক্ষ ভাগাভাগি করতে হয়। ১২ জন এক কক্ষে ঘুমান। কাজেই ব্যাঘাত ছাড়া ঘুম হওয়াটা কঠিনই।
ডা. অ্যালেক্স বলেন, অশান্ত পরিবেশে থাকা সেনাদের ঘুমের কৌশল কোনও কোনও সাধারণ মানুষের কাজে লাগতে পারে। উচ্চ-চাপে থাকতে হয় এমন স্থানে দায়িত্বে থাকা সেনাদের ‘ট্যাকটিক্যাল ন্যাপ’ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কারণটা জানা, তা হলো- তারা হয়তো রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারবে না।
নিউরোসায়েন্টিস্ট ব্র্যাগার বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাও সেনাদের কাছ থেকে শিখতে পারে সাধারণ মানুষেরা, তা হলো ঘুমের রুটিন তৈরি করা। এটি মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে এখন শিথিল হওয়ার সময়, ফলে ঘুম আসে সহজে।
প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যাওয়া, ফোন বন্ধ করা, বই পড়া এবং আলো নিভিয়ে ফেলা- এগুলো দিয়ে ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা শুরু করা যেতে পারে।
ব্রেগার বলেন, শরীর খুব দ্রুত এই অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। আর আপনি যদি প্রতিদিন এটা করেন, তাহলে ঘুমাতে কোনও সমস্যাই হবে না।
Leave a Reply