শীত এলেই অনেকের পরিচিত অভিযোগ মোজা পরেও পা ঠান্ডা, সোয়েটার গায়ে দিয়েও হাত জমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভোর বা গভীর রাতে হাত-পা যেন বরফের মতো ঠান্ডা লাগে। বাংলাদেশে শীত তুলনামূলক কম হলেও এই সময়ে এমন সমস্যা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। কেউ এটাকে স্বাভাবিক শীতের প্রতিক্রিয়া ভেবে এড়িয়ে যান, আবার কেউ অস্বস্তিতে ভোগেন দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু জানেন কি, সব সময় এই ঠান্ডা লাগা শুধু আবহাওয়ার কারণে হয় না? চ্যানেল 24 অনলাইনকে রোহিঙ্গা কনটেস্টে এনজিওর পুষ্টিবিদ চামিলি জান্নাত জানান অনেক ক্ষেত্রে শীতে হাত-পা অতিরিক্ত ঠান্ডা হওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে শরীরের ভেতরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বিশেষ করে ভিটামিন ও পুষ্টির ঘাটতি।
শীতকালে হাত-পা ঠান্ডা হয় কেন: শীতকালে শরীর নিজেকে বাঁচাতে একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালু করে। এ সময় শরীর প্রথমে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্র উষ্ণ রাখতে চায়। ফলে হাত-পায়ের রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে যায় এবং সেখানে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। এর ফলেই হাত-পা ঠান্ডা অনুভূত হয়।
এটি সাধারণত স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু যদি মোজা, গ্লাভস বা গরম পোশাক পরার পরও হাত-পা অতিরিক্ত ঠান্ডা থাকে কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে এই সমস্যা চলতে থাকে, তাহলে সেটি শুধু শীতের প্রতিক্রিয়া নয়। তখন বিষয়টি শরীরের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা পুষ্টির ঘাটতির ইঙ্গিতও হতে পারে বিশেষ করে যখন শরীর ঠিকভাবে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
ভিটামিন বি১২
সাধারণত ভিটামিন বি১২ এর অভাবে হাত-পা বেশি ঠান্ডা লাগে। ভিটামিন বি১২ রক্তের লোহিত কণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ভিটামিনের অভাবে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন ঠিকভাবে হয় না। ফলে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয় এবং শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর অন্যতম লক্ষণ হলো হাত-পা বরফ ঠান্ডা লাগা।
ভিটামিন ১২ সমৃদ্ধ খাবার: মাংস, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, শাক-সবজি ও ফল।
ফলেট (ভিটামিন বি৯)
ফলেটও রক্তকণা তৈরিতে সহায়তা করে। ফলেটের ঘাটতি হলে রক্তাল্পতা তৈরি হতে পারে এবং শরীর ঠান্ডার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
ফলেটসমৃদ্ধ খাবার: পালং শাক, ডাল, শিম, লেবু, কমলা ইত্যাদি।
আয়রন
আয়রন দিয়ে তৈরি হয় হিমোগ্লোবিন, যা শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। আয়রনের অভাবে অক্সিজেন পরিবহন কমে যায়, ফলে শরীর ঠিকভাবে উষ্ণ থাকতে পারে না। আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতায় হাত-পা ঠান্ডা লাগা খুবই সাধারণ লক্ষণ।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার: কলিজা, লাল মাংস, পালং শাক, ডাল।
ভিটামিন সি
ভিটামিন সি সরাসরি হাত-পা গরম করে না, তবে এটি আয়রন শোষণে অত্যন্ত কার্যকর। আয়রন ঠিকভাবে শোষিত হলে রক্তাল্পতার ঝুঁকি কমে এবং শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা উন্নত হয়।
স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের জন্য প্রাকৃতিক ইনসুলেশনের মতো কাজ করে, যা শরীরের ভেতরের তাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের নিচে একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, ফলে ঠান্ডার প্রভাব সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর চর্বি শরীরের হরমোন নিঃসরণ ও কোষের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে, যা তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। বাদাম, অলিভ অয়েল, মাছ ও অ্যাভোকাডোর মতো খাবার নিয়মিত খেলে শীতকালে শরীর তুলনামূলক উষ্ণ থাকতে পারে।
শীতে হাত-পা ঠান্ডা কমাতে খাদ্য পরিকল্পনা: পুষ্টিবিদ চামিলি জান্নাত জানান শীতের দিনে হাত-পা ঠান্ডা কমাতে খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনতে পারেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার: শরীরে তাপ উৎপাদনে সহায়তা করে
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার: রক্তাল্পতা কমায়
বি-ভিটামিন (বি১২ ও বি৯): রক্তকণা ও স্নায়ুর কার্যকারিতা বাড়ায়
ভিটামিন সি: আয়রন শোষণে সাহায্য করে
স্বাস্থ্যকর চর্বি: শরীরের তাপ ধরে রাখতে সহায়তা করে
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন: পুষ্টিবিদ চামিলি জান্নাত জানান শীতের দিনে হাত-পা ঠান্ডা হলে সেটা সবসময় স্বাভাবিক ভাবা ঠিক না। কিছুক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। যদি হাত-পা অতিরিক্ত ও দীর্ঘ সময় ধরে ঠান্ডা থাকে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।এ ছাড়াও অনেক সময় দেখা যায় হাত-পা ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে ক্লান্তি, পেশি দুর্বলতা বা হালকা স্নায়ুবিক সমস্যা দেখা দেয়। এমন হলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
শীতকালে হাত-পা ঠান্ডা লাগা অনেক সময় স্বাভাবিক মনে হলেও, সেটিকে সব সময় অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ এটি শুধু আবহাওয়ার প্রভাব নয়, বরং শরীরের ভেতরের পুষ্টিগত ঘাটতি বা রক্তসঞ্চালনজনিত সমস্যারও ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, ফলেট, আয়রনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের অভাব শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে।
সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ গ্রহণ এবং জীবনযাপনে সামান্য সচেতনতা অনেক ক্ষেত্রেই এই সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তবে শীতের মাঝেও যদি হাত-পা অতিরিক্ত ঠান্ডা থাকে এবং এর সঙ্গে ক্লান্তি, দুর্বলতা বা অন্য শারীরিক উপসর্গ যুক্ত হয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখতে হবে, শরীরের ছোট সংকেতগুলোই অনেক সময় বড় সমস্যার আগাম বার্তা হয়ে আসে।
Leave a Reply