ফাইবার হলো উদ্ভিদভিত্তিক কার্বোহাইড্রেট উপাদান, যা সহজে ভাঙা যায় না এবং অপাচ্য সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে যায়। এটি বেশিরভাগ ফল, সবজি, বাদাম ও পুরো শস্য দিয়ে যায়। দৈনিক ফাইবার গ্রহণের পরিমাণ নির্ভর করে একজন ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ এবং শারীরিক অবস্থার ওপর। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বয়সের ওপর নির্ভর করে প্রায় ৩৪ গ্রাম পর্যন্ত ফাইবার প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বয়সের ওপর নির্ভর করে ২৮ গ্রাম পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে ফাইবার। তবে কারও ৭০ গ্রামের বেশি দিনে ফাইবার গ্রহণ করা উচিত নয়। এতে পেটে গ্যাস, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া হতে পারে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শক্তির প্রয়োজনীয়তার পরিবর্তিত হওয়ার কারণে নিদিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য ফাইবার গ্রহণের পরিমাণ পরিবর্তিত করা হয়। মানুষের ফাইবার গ্রহণ করা কেন প্রয়োজন, এ ব্যাপারে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন দিনাজপুরের রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। এ ব্যাপারে জেনে নেয়া যাক-
বিভিন্ন বয়সে দৈনিক ফাইবার গ্রহণের পরিমাণ:
১৪-১৮ বছর বয়সের ছেলে-মেয়েদের ২৫.২-৩০.৮ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করা উচিত,
৯-১৩ বছর বয়সের ছেলে-মেয়েদের ২২.৪-২৫.৪ গ্রাম,
৪-১৮ বছর বয়সের ছেলে-মেয়েদের ১৬.৮-১৯.৬ গ্রাম,
১-৩ বছর বয়সের ছেলে-মেয়েদের ১৪ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন।
পাচনতন্ত্রকে মসৃণভাবে চালানোর জন্য সঠিক পরিমাণে ফাইবার খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফাইবার গ্রহণের জন্য একটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের খাবারের উৎস থেকে গ্রহণ করা উচিত। ফাইবার সাধারণত দুটি আকারে পাওয়া যায়, দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয়। দ্রবণীয় ফাইবারের মধ্যে পেকটিন, সাইলিয়াম ও বিটা গ্লুকান অন্তর্ভুক্ত। এটি পানিতে দ্রবীভূত হয়ে বড় অন্ত্রে জেল তৈরি করে। অদ্রবণীয় ফাইবার পানিতে দ্রবীভূত হয় না। তবে পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে বর্জ্য চলাচল বাড়ায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়তা করে।
ফাইবারের মধ্যে আরও কিছু যেমন ফার্মেন্টেবল বা গাজনযুক্ত ফাইবার রয়েছে। এগুলো কোলনে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া বাড়াতে সাহায্য করে। গাজনযোগ্য ফাইবারের মধ্যে রয়েছে পেকটিন, বিটা গ্লুকান, গুয়ার গাম, ইনুলিন, অলিগোফ্রুক্টোজ। প্রিবায়োটিক ফ্রুক্টো-অলিগোস্যাকারাইড রয়েছে এখানে। এগুলো প্রোবায়োটিকের বৃদ্ধি, অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া এবং শর্ট চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপাদনকে বৃদ্ধি করে। এগুলো হলো রসুন, পেঁয়াজ, সয়াবিন অ্যাসপ্যারাগাস ইত্যাদি। গাজনযোগ্য ফাইবারের সর্বোত্তম খাদ্য উৎস হলো মটরশুটি, শিম। এককাপ পরিবেশনে দৈনিক ফাইবার গ্রহণের অর্ধেক পর্যন্ত সরবরাহ করে।
ফাইবারের উপকারিতা:
নিয়মিত ফাইবার গ্রহণ করা হলে হজমের স্বাস্থ্যে উন্নতি করে, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে, হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করে, টাইপ টু ডায়াবেটিসসের ঝুঁকি কমায়। কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করে, লো-ডেনসিটি লাইপেপ্রোটিনের মাত্রা কমায়, দীর্ঘ সময়ের জন্য পূর্ণবোধ বা তৃপ্তিবোধ করে, ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
অধিক ফাইবার গ্রহণের অসুবিধা:
অধিক পরিমাণ ফাইবার গ্রহণের ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধা হতে পারে। যেমন- পেটে গ্যাস বা ফাঁপা হওয়া, ক্ষুধাহ্রাস এবং কিছু পুষ্টির ঘাটতি, যেমন- ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক। অধিক ফাইবার গ্রহণের কারণে পর্যাপ্ত তরল পান না করলে অন্ত্রে ব্লক হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কোন খাবারে কতটুকু ফাইবার পাওয়া যায়:
একটি মাঝারি কলাতে ২.৬ গ্রাম ফাইবার থাকে। মাঝারি আপেলে ৪.৪ গ্রাম, চামড়াসহ বেকড আলুতে ৩.৮ গ্রাম, ১ কাপ মটরশুটিতে ৬.৮ গ্রাম, এককাপ রান্না করা মসুর ডালে ১৫.৬ গ্রাম, এককাপ রান্না করা বাদামি চালে ১.৮ গ্রাম ফাইবার থাকে। এছাড়া ১০০ গ্রাম ডুমুরে ২.২ গ্রাম, একটি মাঝারি নাশপাতিতে ৫ গ্রাম, এককাপ ডাবের পানিতে ৭.২ গ্রাম ও একটি মিডিয়াম সাইজেন অ্যাভোকাডো থেকে ১০ গ্রাম পরিমাণ ফাইবার পাওয়া যায়।
পরামর্শ:
যে খাবার যত বেশি প্রাকৃতিক এবং প্রক্রিয়াবিহীন হবে, তাতে ফাইবারের পরিমাণ তত বেশি হবে। প্রতি ১০০০ ক্যালরি গ্রহণের জন্য ১৪ গ্রাম ফাইবার গ্রহণ করা উচিত। এটি পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে আলাদা। নারীদের জন্য ২৪ থেকে ৩০ গ্রাম এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৮ গ্রাম পর্যন্ত গ্রহণ করতে হতে পারে।
আপনি যদি উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার নতুনভাবে গ্রহণ করা শুরু করেন, তবে ধীরে ধীরে বাড়াবেন। কেননা, ধীরে ধীরে ফাইবার গ্রহণ বাড়ালে পাচনতন্ত্রের ওপর কম চাপ পড়বে, যা অন্ত্রের গতিবিধি ঠিক রাখতে সাহায্য করবে। ফাইবার পানি শোষণ করে। অতএব, যত বেশি ফাইবার গ্রহণ করবেন, তত বেশি তরল বা পানি গ্রহণ করা উচিত।
সারাদিন খাদ্য তালিকা থেকে ফাইবার পেতে বিভিন্ন ধরনের খাবার যেমন- ফল, শাকসবজি, শস্য, বাদাম, বীজ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে খাদ্যতালিকায়। ফাইবার বেশি পেতে চামড়াযুক্ত বা খোসাসহ পুরো শস্য, ফল ও সবজি গ্রহণ করতে হবে। ফলের রসের পরিবর্তে গোটা ফল খেতে হবে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বেশি ফাইবার গ্রহণ করা যাবে না।
Leave a Reply