১৯৯০ সাল। কবি এম. এ মতিন বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা-লেখি করেন। তার স্ত্রী জাহানারা মতিন ও ভাতিজাও লেখেন। তাদের বাসা মতিঝিল ১০ কি.মি দূরে। এলাকার নাম বেগুন বাড়ি। তখনও পূর্ণ শহর গড়ে উঠেনি। গ্রাম গ্রাম দেখতে। তাদের অনেক জমি। তিনি কোন চাকরি ব্যবসা করেন না। স্ত্রী সরকারি চাকরি করতেন। মাঝে মাঝে তিনি মঞ্চ নাটক করতেন। শহরে কবির শশুরের বাসা। একদিন শহরে গুলিস্তান থেকে হাঁটতে হাঁটতে বঙ্গভবনের দক্ষিণ পাশের রাস্তা দিয়ে বিক্রমপুর হাউজের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন। ফুটপাতে একটি বইয়ের দোকান। অতি সাধারণ ময়লাযুক্ত পোশাক পরে একজন যুবক বসে আছে। তিনি বইয়ের নাম পড়তে যাবেন। বই হাতে নেয় আবার রাখেন। যুবকটি তার দিকে বার বার লক্ষ্য করতে থাকে। তাকে ব্যতিক্রমের ব্যক্তি মনে হল। খুব উন্নত মানের পোশাক গায়ে। পায়ে বুট জুতো। তিনি প্রতিভা নামে একটি ম্যাগাজিন দেখতে পেলেন। সম্পাদক জনপ্রিয় ছড়াকার। পাশাপাশি অনেক লেখা ছাপা হয়েছে।
ঃ এই লেখক কি এখানে আসেন?
ঃ এটাতো আমার নাম।
ঃ আপনি নামকরা লেখক আর এখানে বসে—
ঃ আপনার নাম।
ঃ এম. এ মতিন।
ঃ মানে, আপনার স্ত্রীর নাম জাহানারা মতিন, আপনার ভাতিজার নাম আজহারুল ইসলাম।
ঃ আপনি জানেন কি করে?
ঃ গতকাল এখানে এসেছিল। এমদাদুল ইসলাম কাঞ্চন ভাইয়ের সাথে।
ঃ এটা করেন কেন?
ঃ খাওয়াতো লাগবে?
ঃ আপনার বাসা কোথায়?
ঞ বাসা কোথায় পাব। ঐ বিক্রমপুর হাউজের তৃতীয় তলায় থাকি।
তিনিও একসময় ফুটপাতে বসে পড়েন।
ঃ আপনি এখানে।
ঃ তাতে কী? আপনার মত বিখ্যাত ব্যক্তি যদি এখানে বসতে পারে, আমি বসলে দোষ হবে না।
ঃ আমিতো অতি সাধারণ ফুটপাতের মানুষ।
ঃ আপনি একজন কবি। আপনার লেখা পড়ে ভাবীর সাথে মাঝে মাঝে আলোচনা হয়।
ঃ কি আলোচনা হয়?
ঃ এত লেখা যখন আপনার প্রকাশ আপনি হয়তো ধনী হবেন।
ঃ আর বাস্তবে দেখলেন ফুটপাতের মানুষ আমি।
ঃ সত্যই আপনার জন্য খারাপ লাগছে। আপনার বাড়ি কোথায়?
ঃ খুলনায়।
ঃ সেখানে কে কে আছে?
ঃ আছে সব, আবার কেউ নেই।
ঃ মানে?
ঃ আমার লেখা-পড়া ও লেখালেখি কেউ পছন্দ কওে না। ১৯৮০ সাল থেকে পরিবার থেকে অবজ্ঞা, অবহেলা আর শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন পেয়ে আসছি। ১৯৮৩ সালে গৃহ ত্যাগ করেছি।
ঃ এর মধ্যে বাড়ি যাননি।
ঃ ৮৩ সালে ভারত যাই। ২ মাস পর আব্বা নিয়ে আসেন।
৮৫ সালে আবার ভারত যাই, মামা নিয়ে আসেন। ৮৭ সালে আমি ঢাকায় চলে আসি। ৮৮ সালে বাড়ি যাই কিন্তু নির্যাতন বন্ধ হয়নি। তাই ৯০ সালে আবার ঢাকায় চলে আসি। আজ ফুটপাতের মানুষ।
ঃ আপনার উপর এই নির্যাতন কেন?
ঃ সেলিম মানে চরিত্রহীন যুবকের ষড়যন্ত্রের কারণে। প্রতিবাদ করেছি তাই নির্যাতন।
আপনার অনেক দুঃখের কথা শুনলাম। অনেক সময় কাটালাম। আজ আমি। আবার আসব।
ঈদের দিন। ঈদে যাওয়ার মত কোন পোশাক নেই। এখানে পানির খুব অভাব তাই ঠিক মত গোসল করা কাপড় ধোয়া যেত না। আলুর চাটনী দিয়ে ভাত খেয়ে শুয়ে আছে। ইচ্ছে করলে কবিদের বাসায় যেতে পারত। ভাল ভাল খাবার খেতে পারত। কোথাও না গিয়ে ঘরেই থাকল। তখন দুপুর কবি মতিন এলেন।
ঃ কি ব্যপার ঈদের দিন শুয়ে আছেন?
ঃ কি করব বলুন। একা একা ভালো লাগছে না। তাই শুয়ে আছি। আর শুয়ে শুয়ে ছোট বেলার ঈদের কথা মনে পড়ে গেল।
ঃ কি কথা।
ঃ আব্বা আমাদের সব ভাই বোনদের ঈদে নিয়ে যেতেন। বোনেরা রুস্তুম চাচার বাড়িতে থাকতো। নামাজ শেষে একসাথে হয়ে মেলা থেকে মাটির খেলনা কিনতাম। একবার ৪টি মাটির হাতি, ৪টি নৌকা, ৪টি ঘোড়া, ৪টি পালকী কিনেছিলাম।
ঃ পুরনো কথা ভেবে আর কি লাভ হবে। বাসায় গিয়ে আপনার ভাবীর সাথে আপনার কথা বলেছি। খুব অবাক হয়েছেন ও দুঃখ পেয়েছেন। আজ আপনার ভাবী পাঠিয়েছেন আমাকে।
ঃ কেন?
ঃ আপনাকে নিয়ে যেতে।
ঃ আমি যাব না।
ঃ তিনি জোর করে নিয়ে গেলেন। তারা খুব আদর করে খাওয়ালেন। এতো ভালোবাসার কথা কোনদিন ভুলতে পারিনি। খাওয়া শেষ হলে তারা খুব আন্তরিকতার সাথে বললেন,
ঃ আমরা আপনাকে একটা কথা বলব। রাখবেন।?
ঃ কথাটি কি
ঃ কথা দেন। রাখবেন আমাদের কথা।
ঃ আচ্ছা রাখবো।
ঃ আমরা আপনাকে কিছু কাপড় দিতে চাই।
ঃ ঠিক আছে আপনাদের ভালবাসার কাছে হার মেনে গেল ফুটপাতের যুবকটি।
আমার গল্প প্রকাশ করায় খুব খুশি হয়েছি
ধন্যবাদ কবি