সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, ঝাল ও মশলাদার খাবার খাওয়া হচ্ছে। শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, বাসা-বাড়ি কিংবা এর বাইরে রেস্টুরেন্টে বা পার্টিতে মুখরোচক বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়া হয় আমাদের। কেউ কেউ আবার অন্যদের দেখাদেখি নিজেকে এগিয়ে রাখতেও অনেক বেশি পরিমাণ এ ধরনের খাবার খেয়ে থাকেন।
ঝাল ও মশলাদার খাবার খাওয়া সবসময়ই ক্ষতিকর, যা অনেকেরই জানা। যা তাৎক্ষণিক সমস্যা সৃষ্টি না করলেও অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদানকারী প্লাটফর্ম ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক অর্গানাইজেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, অত্যন্ত ঝাল খাবার খাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে এসব খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে।
ঝাল খাবার মুখরোচক হয় কীভাবে:
মরিচ তেলভিত্তিক পদার্থ ক্যাপসাইসিন থেকে তাপ পায়। ক্যাপসাইসিনের পরিমাণ যত বেশি হবে, মরিচ তত ঝাল হবে। কোনো খাবারে ক্যাপসাইসিনের পরিমাণ স্কোভিল তাপ ইউনিটে পরিমাপ করা হয়। ক্যাপসাইসিনের প্রতি সবার প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন জরুরি সেবা প্রদানকারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. অ্যালান ক্যাপিন।
এ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, কিছু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জিনগত কারণে ঝালের প্রতি বেশি সহনশীল হয়ে থাকে। তারা ক্যাপসাইসিনের জন্য কম রিসেপ্টর নিয়ে জন্মায়, যা তাদের তাপের জন্য অন্তর্নিহিত সহনশীলতা প্রদান করে। অন্যদের ক্ষেত্রে এই ক্যাপসাইসিনের প্রতি তাদের শরীরের ব্যথা রিসেপ্টরগুলোর প্রতিক্রিয়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এটি তাদের উচ্চতর ঝাল সহনশীলতা বিকাশ করতে সহায়তা করে
ঝাল খাবার খাওয়ার কোনো ঝুঁকি রয়েছে:
খুব বেশি ঝাল খাবার খাওয়ার সবথেকে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হচ্ছে অসুস্থ হয়ে পড়া। বিশেষ করে যারা ঝাল খাবার খেয়ে অভ্যস্ত নয়, তাদের ঝুঁকি বেশি থাকে। আবার গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল (জিআই) সমস্যা, জিনগতভাবে ক্যাপসাইসিনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, প্রচুর পরিমাণ ক্যাপসাইসিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করা হলে সমস্যা দেখা দেয়।
ক্যাপসাইসিনের ত্বকে তাপ গ্রহণকারীদের ট্রিগার করার বেশ ক্ষমতা রয়েছে। ফলে স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, যা শরীর অতিরিক্ত গরম করে। মস্তিষ্ককে শীতলকরণ প্রক্রিয়া করার সংকেত দেয়। ঝাল খাবার খাওয়া হলে শুধু স্বাদই গ্রহণ করা হয় না, তা অনুভবও করা হয়।
ড. অ্যালান ক্যাপিন ক্যাপসাইসিনের তাপকে আগুনের ওপর হাত রাখার সঙ্গে তুলনা করেছেন। হাত যখন দূরে থাকে, তখন হালকা তাপ অনুভব করা হয়, যা হালকা ঝাল খাবার খাওয়ার মতো। কিন্তু হাত যতটা আগুনের কাছাকাছি যাবে (যত বেশি ক্যাপসাইসিন খাবেন), ততই অস্বস্তি অনুভব করবেন। এমনকি পুড়েও যেতে পারেন।
ঝাল খাবার খাওয়া হলে অভ্যন্তরীণ জ্বালা, প্রদাহ ও ব্যথার কারণ হতে পারে। শরীর ক্যাপসাইসিনকে একটি বিষাক্ত পদার্থ হিসেবে দেখবে এবং এ থেকে মুক্তির চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে পেট ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা ডায়রিয়া, বুকব্যথা, মাথাব্যথা, তীব্র বমির মতো সমস্যা হবে। আবার এতটাই শারীরিক ক্ষতি হতে পরে যে, জরুরি চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে। বমি থেকে উৎপন্ন গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড খাদ্যনালী ও গলা পুড়িয়ে দিতে পারে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, অধিকাংশ মানুষই এই মাত্রার তাপে অভ্যস্ত নয় এবং যখন তারা ওয়ান চিপ চ্যালেঞ্জের মতো কিছু করে, যেখানে অতিরিক্ত ঝালযুক্ত টরটিলা চিপ খাওয়া হয়, তখন শূন্য থেকে ১০০-তে চলে যায় তারা। এর জন্য প্রস্তুত না থাকলে এটি পেটে অনেকটা বোমা বিস্ফোরণের মতো কাজ করে।
ঝাল খাবার কি আলসারের কারণ:
ঝাল খাবার আলসার সৃষ্টি করে, এ কথা সত্য নয়, কেবলই গুজব। ঝাল খাবার নিজে কখনো আলসার সৃষ্টি করে না। গবেষণা অনুযায়ী, ঝাল খাবার মূলত এইচ. পাইলর নামক ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি বন্ধ করে আলসার প্রতিরোধে সহায়তা করে। যা এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর কারণ। ক্যাপসাইসিন অ্যাসিড তৈরি হতেও বাধা প্রদান করে, কারণ এটি ক্ষারীয়।
তবে আপনার আগে থেকেই আলসার থাকলে ঝাল খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। এসব পেটের আলসার তৈরি না করলেও, আগে থেকে আলসার থাকলে তা অধিকতর খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ঝাল খাবার থেকে কি মৃত্যু হতে পারে:
ড. অ্যালান ক্যাপিন বলেন, সবচেয়ে ঝাল মরিচ, যেমন জায়ান্ট মরিচ মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। যা খুবই অসম্ভবপর ব্যাপারে। প্রচুর পরিমাণ খাওয়া হলে, উদাহরণস্বরূপ, ওজন যদি ১৫০ পাউন্ড হয়, তাহলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির জন্য ৩ পাউন্ড জায়ান্ট মরিচ বা ভূত মরিচ খেতে হবে। নিয়ম হচ্ছে, নিজের স্বাস্থ্যের ১/৫০ ভাগের বেশি এ ধরনের মরিচ খাওয়া যাবে না।
Leave a Reply