শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন

পরিবহন সংকটে বাড়ছে পণ্য-পরিবহন খরচ, পিয়াজের বাজারে অস্থিরতা

মৃণাল চৌধুরী সৈকত
  • আপলোডের সময় : রবিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৩
  • ৭৪ বার

বিএনপি-জামায়াতের ডাকা হরতাল-অবরোধ এবং পরিবহনে অগ্নি সংযোগের কারণে সংকটে পড়েছে দেশের পণ্য পরিবহন ব্যাবস্থা। ঢাকামুখী কিংবা ঢাকা থেকে দেশের অন্যান্য স্থানে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান পণ্য সরবরাহ কমেছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে পরিবহন মালিকপক্ষ রাস্তায় ট্রাক বা কাভারভ্যান ছাড়ছেন না। এ সুযোগে যারা পণ্যপরিবহন করছেন তারা ভাড়া বাড়িয়েছেন ২০-৩০ শতাংশ। একই দূরত্বে আগের তুলনায় বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে দুই থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এদিকে সম্প্রতি ভারত সরকার তাদের দেশের পেয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষনা করার পর রাতারাতি পেয়াজের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বাজার মনিটরিংয়ে ভোক্তা অধিকার কাজ করলেও কোন সুফল বয়ে আনতে পারছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যসামগ্রী, চাল ডালসহ কাচামাল তরিতরকারী মাছ মাংসের দাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নি¤œ আয়ের সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসে নাভিশ^াস।
অন্যদিকে বিভিন্ন পরিবহন মালিকদের দাবি, ঝুকির কারণে অনেকেই গাড়ি বের করতে চাচ্ছেন না। গাড়ি চালক ও সহকারীর জীবনের ঝুকি নিয়ে চলছে বেশিরভাগ পরিবহন। তারপরেও ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। কিছু ক্ষেত্রে সংকটের কারণে বেশি নেওয়া হচ্ছে।
খোজ নিয়ে জানা যায়, ঝুকিপূর্ণ এলাকায় র‌্যাব ও পুলিশি পাহারায় রপ্তানি পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল করলেও সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে খুব বেশি নিরাপত্তা নেই। ফলে কিছু কিছু পণ্যের পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিচ্ছিন্ন বেশ কিছু ঘটনাও ঘটেছে যাতে পরিবহনের ক্ষতি হয়েছে।
পরিবহন মালিকদের কয়েকজন জানান, আমার যারা চুক্তিতে পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে গাড়ি নিচ্ছি তারাও সমস্যায় পড়েছে। তারা এখন চাহিদামতো গাড়ি দিতে চাচ্ছে না। কম গাড়ি থাকায় বেশিরভাগ মালিক মনগড়া ব্যবসা করছে। এখন ভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। পরিবহন সংকট নিয়ে কথা হয় বেশিকিছু পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে। পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই পরিবহন সংকট এবং সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে একশ্রেনির পরিবহন মালিকের মনোগড়া ব্যবসার কথা বলেছেন।
আকিজ প্লাস্টিক ও পিভিসি ডিস্টিবিউশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার আবু হেনা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা যারা চুক্তিতে পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে গাড়ি নিচ্ছি তারাও সম্যায় আছি। তাদের গাড়ির প্রফিট কমে গেছে, তারা এখন চাহিদামতো গাড়ি দিতে চাচ্ছে না। যে সব মালিকের গাড়ি বেশি থাকছে সে গাড়িগুলো দিচ্ছেন। বাইরে থেকে গাড়িগুলো নিতে গেলে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। কম গাড়ি থাকায় বেশিরভাগ মালিক অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন।
পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিকদের সংগঠনগুলো বলেছে, হরতাল-অবরোধের কারনে পণ্য পরিবহন অর্ধেকে নেমেছে গেছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গাড়ি চলছে অর্ধেক। কিছু মালিক ঝুকির কারনে গাড়ি চালাচ্ছে না। আবার কোন কোন কারণে বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি বসে রয়েছে। বসে বসে লোকসান গুনছেন মালিকপক্ষ। এখন ভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ। একটি গাড়ি যদি একদিন বসিয়ে রাখা হয় তাহলেও এর পেছনে পার্কিং খরচ, শ্রমিকদের বেতন দিয়ে প্রায় আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়। এভাবে প্রায় এক লাখের বেশি গাড়ি এ হারতাল-অবরোধে বসে রয়েছে।
বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাকপণ্য পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মকবুল আহমেদ বলেন, করোনা মহামারী পরপরই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে দেশের পরিবহন ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। এর মধ্যে হরতাল-অবরোধের প্রভাব সকল ব্যবসাÑবাণিজ্যে পড়েছে মারাত্মক ভাবে। এছাড়া নিত্যপন্যের মূল্য বৃদ্ধিতো রয়েছেই, বিশেষ করে পরিবহনে ক্ষতি ভিন্নমাত্রা নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মসুচির সমস্ত আক্রমনের লক্ষ্যে পরিনত হয়েছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান,বাস। এ পরিস্থিতিতে পরিবহন ব্যবসায় লালবাতি জ¦লতে বাকি নেই।
মকবুল আহমেদ আরো বলেন, যে পরিমান ঝুকি তারপরেও ট্রাক আগের ভাড়ায় চলছে। কোথাও কোথাও দু-এক হাজার টাকা বেশী দিতে হচ্ছে যেখানে পরিবহন সংকট রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে ভাড়া এখনো বাড়েনি।
গাজীপুর জেলা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আজাদ হোসেন বলেন, বিরোধী দলের ডাকা হরতাল অবরোধের মধ্যেও বর্তমান সরকার আমাদের যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা এবং পরিবহন চালনায় নিরাপত্তা দিয়েছেন, বিশেষ করে আইনর্শৃংখলা বাহিনী র‌্যাব, পুলিশের সহযোগীতায় আমরা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান রাস্তায় চালাতে পারছি। কিন্তু পন্যসামগ্রী আমদানী ও রপ্তানীকারকগন হরতাল অবরোধে তাদের ক্ষতির ভয়ে আমদানী রপ্তানী বন্ধ রাখায় আমাদের বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে পরিবহন বসিয়ে রেখে পার্কিং খরচসহ স্টাফদের বেতন গুনতে হচ্ছে। তাছাড়া নিত্যপন্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পন্যবাহী যানবাহন রাস্তায় নামার পর খরচও বেড়েছে, অথচ তুলনামূলক আমাদের পন্যপরিবহন খাতে ভাড়া তেমন বাড়েনি। আশা করছি পন্যপরিবহনের এ সমস্যা অতিদ্রুত শেষ হয়ে যাবে। নয়তো আমাদের পথে বসতে হবে।
এছাড়াও বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির কয়েকজন নেতা বলেন, একটি গাড়ি যদি একদিন বসিয়ে রাখা হয় তাহলেও এর পেছনে পার্কিং খরচ শ্রমিকদের বেতন দিয়ে প্রায় দুই আড়াই হাজার টাকা খরচ হয়। এভাবে প্রায় এক লাখের বেশি গাড়ি এ হরতাল-অবরোধে অচল বসে রয়েছে। মালিকদের দুই সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ঠ না হলেও সারাদেশে প্রায় তিন লাখ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান রয়েছে। রাস্তায় গাড়ি পোড়ানোর মতো ঘটনা গাড়ির মালিকদের চিন্তিত করে রাখে।
মো.আব্দল মজিদ নামের একজন গাড়ি মালিক জানান, একটি ট্রাক যদি আংশিক পোড়ানো হয় তাহলেও সেটা সারাতে ৪/৫ লাখ টাকা খরচ হয়। আর যদি ইঞ্জিনসহ পুড়ে যায় তাহলে ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ লোকসান মালিককে দিতে হয়। ইন্স্যুরেন্স থাকলেও সে সুবিধা পাওয়া যায় না। পন্য সরবরাহকারীরা জানান, আগে উত্তরবঙ্গ থেকে চট্টগ্রামে ২০ থেকে ২১ হাজার টাকার মধ্যে চাল ও ডাল পরিবহন করা যেতে। বর্তমানে সেই ভাড়া ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ট্রাকভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা। অবরোধের আগে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত একটি আট টনের ট্রাকের ভাড়া ছিলো ১৬/১৭ হাজার টাক। কিন্তু এখন ২১ হাজার টাকা। সাড়ে ১২ টনের ট্রাকের ভাড়া ছিলো ২৬ থেকে ২৮ হাজার টাকা যা এখন ৩১ থেকে ৩৩ হাজার। একটি ট্রাক অবরোধের আগে ঢাকায় আসতো ১৫ হাজারের মধ্যে এখন অসছে ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকায়। তবে ঢাকা থেকে বেনাপোল যাওয়ার পথে ভাড়া কিছুটা কম ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে। তেজগাও ট্রাকষ্ট্যান্ডের জহিরুল হোসেন নামে একজন কাভার্ডভ্যান মালিক বলেন, পরিবহন মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক আছে। চোরাগোপ্তা হামলা হচ্ছে। ট্রাকে আগুন দিলে তার দায় নেবে কে ?
এদিকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির দিনে পণ্যবাহী পরিবহন, তেলবাহী পরিবহন, দূরপাল্লার গণপরিবহন ও অন্য যানবাহন এস্কর্ট বা নিরাপত্তা দেবে র‌্যাব। গত ১৮ নভেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় বিশেষায়িত এ সংস্থাটি। গত ৩০ অক্টোবর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত র‌্যাব দেশব্যাপী পণ্যবাহী পরিবহন, তেলবাহী পরিবহন, দূরপাল্লার গণপরিবহন ও অন্যান্য যানবাহনের দুই শতাধিক কনভয়ের মাধ্যমে মোট ১৭ হাজারের অধিক যানবাহনকে নিরাপত্তা দিয়ে নিরাপদ গন্তব্যস্থলে পৌছে দিয়েছে বলে জানানো হয় ওই সংবাদ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। এছাড়া বিরোধী দলের ডাকা হরতাল, অবরোধের মতো চলমান পরিস্তিতিতে র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনী দেশের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশব্যাপী পণ্যবাহী পরিবহন, তেলবাহী পরিবহন, দূরপাল্লার গণপরিবহন ও অন্যান্য অধিক যানবাহনকে নিরাপত্তা দিয়ে নিরাপদে গন্তব্যস্থলে পৌছে দিচ্ছে। এতে করে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক এবং নেতৃবৃন্দ বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories