ফাল্গুনের পর এক মহাযুদ্ধে নেমেছেন উপকূলের তৃষ্ণার্ত মানুষ। আর এই যুদ্ধের নাম সুপেয় পানির যুদ্ধ। দক্ষিণ অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষ যুগ যুগ ধরে পানির মধ্যে বসবাস করলেও সুপেয় পানির জন্য হাহাকার। নেই জীববৈচিত্র্যের জীবন ধারনের পানির উৎস। প্রতিদিন দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে না হতেই মেঠোপথ ধরে পানি সংগ্রহে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন গ্রামে গৃহবধূরা। অনেক গ্রামের মানুষ ৪-৫ কিলোমিটার পথ পাড়িদেন সুপেয় পানি সংগ্রহে। গাবুরা, বুড়িগেয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, পদ্মপুকুর , কৈখালী ইউনিয়নের অনেকেই ট্রলার যোগে দুরদুরান্ত থেকে পানি সংগ্রহে যান। এক কলস পানি সংগ্রহে যে সময় লাগে তাতে ওই পানির মূল্যে পড়ে ১শ টাকা। পড়াশোনা বাদ রেখে পানি সংগ্রহে স্কুল-কলেজপড়–য়া শিক্ষার্থীরা ও পানি সংগ্রহে নামতে দেখা যায়।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গভীর নলকূপের ব্যবস্থা থাকলেও পানির স্তর নেমে যাওয়ার নতুন ভোগান্তি শুরু হচ্ছে এলাকা বাসির মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত খরা তাপের ফলে এলাকার মিষ্টি পানি আধার শুকিয়ে চৌচির হতে শুরু করেছে। জীবন যুদ্ধে হার মানতে নারাজ উপকূলের মানুষগুলো পানির তৃষ্ণা মেটাতে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবাণক্ততার প্রভাব দিনদিন বেড়েই চলেছে। যার ফলে সুপেয় এবং নিরাপদ পানির আঁধার দিন দিন কমে যাচ্ছে।প্রাচীনকালে বিভিন্ন ধরনের নিত্যকার দিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের বিনিময় প্রথা চালু থাকলেও বর্তমান সময়ে গ্রামঞ্চলে পানি বিনিময়ের কথা শোনা যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল শ্যামনগর উপজেলার রাজা প্রতাপাদিত্যর রাজধানী ধুমঘাট শাপলা নারী উন্নয়ন সংগঠনের সদস্যদের সাথে আলাপকালে সংগঠনের সভাপতি অল্পনা রানী মিস্ত্রি বলেন, চৈত্রের আগমনের সাথে সাথেই এলাকাজুড়ে পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। তিনি আর বলেন, বর্তমানে আমরা এখান থেকে ৭ কি.মি. দূর থেকে ভ্যান যোগে রির্ভাস ওসমেসিস প্লান্ট থেকে পানি নিয়ে আসি। যেখানে প্রতি লিটার পানির দাম পড়ছে ১ টাকা প্রতিদিন ভাতের চেয়ে পানির চিন্তা এখন প্রতিটি পরিবারজুড়ে। বর্তমান সময়ে মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিনিময়ে পানি নিচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলা সদরের কাশিপুর গ্রামে বসবাসরত আদিবাসি মুন্ডা জনগোষ্ঠীর সাথে কথা বলে জানা যায় পানির জন্য হাহাকারের শেষ নেই তাদেরও, তাদের সাথে কথা বলতেই প্রথমেই তাদের মুখে ফুটে ওঠে সুপেয় পানির কষ্টের কথা। তীব্র দাবদাহে গরমের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অসহ্য হয়ে উঠে জীবন ধারণ। গ্রামের মেঠো পথ ধরে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যে পরিমাণ পানি আনা যায়, তার চাইতে শরীরে ঘাম যেন আরো বেশি বের হয় নারীদের, এমনটাই বলছিলেন ওখানকার নারীরা। ভোরের সূর্য উকি দেওয়ার আগেই পানি আনতে যায় নারীরা কিন্তু পৌছাতে সামান্য দেরি হলেই সব মিলিয়ে তাদের দুই থেকে তিনটি মূল্যবান ঘন্টা পেরিয়ে যায় পানি আনার কাজে। এ যেন ছকে বাঁধা এক সংগ্রামী জীবন।উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নে গিয়ে একই চিত্র দেখা যায়। বিগত ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এলাকার অধিকাংশ মিষ্টি পানির আঁধার। এরপর থেকে আর থামেনি সুপেয় পানির হাহাকার। বর্ষা মৌসুমে কিছুটা লাঘব হলেও চৈত্রের শুরু থেকেই শুরু হয় তীব্র পানির কষ্ট। এলাকায় দু একটি গভীর নলকূপ থাকলেও খরায় পানি স্তর কমে যাওয়ায় ঠিকমতো পানি পাওয়া যায় না এমনটাই বলেছেন এলাকার মানুষেরা। উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের বয়োজ্যেষ্ঠ সুশীল মন্ডল ও সায়েক ঢালী বলেন, বর্তমান সময়ে যেভাবে সুপেয় পানির সংকট দেখা যাচ্ছে তা আগে কখনো দেখিনি। যতদিন যাচ্ছে তত সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে। এ সময় তিনি সরকারি সেরকারি প্রতিষ্ঠানের নিকট মিষ্টি পানির আঁধার তৈরির আহবান জানান। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শ্যামনগর উপজেলায় আর্সেনিকের প্রকোপ বেশি না হওয়ায় নলকূপের পানি পান যোগ্য। সদর ইউনিয়ন এবং ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নরে কিছু জায়গায় আর্সেনিক পাওয়া গেলেও তা ০.০৫ এর নিচে থাকায় সমস্যা হয় না। এ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে পানির স্তর ১৩ থেকে ২০ ফিট নিচে থাকে তবে চৈত্র কিংবা খরার সময় তা আরো ৫ থেকে ৭ ফিট নিচে নেমে যায়। তবে বর্তমান সময়ে খুব বেশি পানির তীব্রতা দেখছি না আশা করা যাচ্ছে আগামী সপ্তাহে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। যেটুকু সমস্যা দেখছি তা বৃষ্টি হলে আর থাকবে বলে মনে করছি না।
Leave a Reply